বন্ধ হয়নি অস্ত্রের ঝনঝনানি,আজও অস্থিতিশীল পাহাড় - Alokitobarta
আজ : মঙ্গলবার, ২০শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ

বন্ধ হয়নি অস্ত্রের ঝনঝনানি,আজও অস্থিতিশীল পাহাড়


প্রতিবেদক,আলোকিত বার্তা :পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির ২৮ বছর পূর্তি আজ।সবশেষ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ১৮ ও ১৯ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে, ২০ সেপ্টেম্বর রাঙামাটিতে এবং চলতি বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির রামগড় রামেসু বাজারে পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে ভয়াবহ সংঘাত হয়। এসব ঘটনায় প্রাণ হারান ৭ জন। শুধু বান্দরবানে গেল সাত বছরে সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হয়েছেন ৫২ জন। এছাড়া বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের সমর্থকদের মধ্যেও প্রায়ই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।বহুল আলোচিত এই চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তির প্রত্যাশা জেগেছিল। কিন্তু আজও অস্থিতিশীল পাহাড়। রয়ে গেছে অস্ত্রের ঝনঝনানি। প্রায়ই ঘটছে সংঘর্ষ-হানাহানি।

জানা গেছে, তৎকালীন সংঘাতময় পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে ঐতিহাসিক চুক্তিটি হয়। এতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে স্বাক্ষর করেছিলেন সরকার পক্ষে আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অধিবাসীদের পক্ষে জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা।

জনসংহতি সমিতির নেতাদের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছার অভাবে পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৩৪টি বাস্তবায়িত হয়েছে। ১৫টির আংশিক বাস্তবায়িত হলেও এখনো ৯টি ধারা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায়। আর বাকি ধারাগুলো বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময়েও অগ্রগতি নেই। ২০০৯ সালের পর টানা এক যুগের বেশি ক্ষমতায় থাকলেও চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়ন না হওয়ায় আওয়ামী লীগকে দায়ী করছে আঞ্চলিক সংগঠনগুলো।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা বলেন, চুক্তি হয়েছে ২৮ বছর। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ২০ বছর ক্ষমতায় ছিল। তারা চুক্তি করেছে কিন্তু বাস্তবায়ন করেনি। এক কথায় বলতে গেলে, তারা জুম্ম জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারও চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

আরেক আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) সাংগঠনিক সম্পাদক অমর জ্যোতি চাকমা বলেন, এটা হতাশাজনক। চুক্তি নিয়ে যে সুফল আশা করেছিলাম, সেটা আমরা পাইনি। কিছু গোষ্ঠী ও আঞ্চলিক সংগঠনও চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার জন্য দায়ী।

ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) বান্দরবান শাখার আহ্বায়ক রামতাং সাং মালেক বম বলেন, চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাহাড়ের সশস্ত্র গ্রুপগুলো সুযোগ নিচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশ থেকেও চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করতে নানাভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে। ভারতের মিডিয়াগুলো বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান কাজী মো. মজিবর রহমান বলেন, পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে একটি পক্ষকে (পাহাড়ি) লাভবান করা হয়েছে আর অপর পক্ষকে (বাঙালি) ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। এর ফলে পাহাড়ে এখনো অশান্তি বিরাজ করছে।

খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সভাপতি ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, শান্তি চুক্তির মধ্য দিয়ে পাহাড়ে বৈষম্য ও বিভেদের পাশাপাশি পাহাড়িদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত বেড়েছে। চুক্তি করে আওয়ামী লীগ জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।

এদিকে পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২৮তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে আজ রাঙামাটিসহ তিন পার্বত্য জেলায় গণসমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল করবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। সকালে রাঙামাটি শহরের রাজবাড়ী জিমনেসিয়াম প্রাঙ্গণে গণসমাবেশের পর বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দিয়েছে তারা। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান সন্তু লারমা। এছাড়া আলোচনা সভার আয়োজন করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ।

পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি : পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে জাতীয় সংলাপ ও কার্যকর রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের নেতারা। সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন তারা। এতে অংশ নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়ক ও নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন লিখিত বক্তৃতায় বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের জুম্ম আদিবাসী জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন রাজনৈতিক অধিকার ও সাংস্কৃতিক বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির পুনর্গঠন আশা জাগালেও ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের সভা স্থগিত এবং টাস্কফোর্সের কার্যক্রম থমকে যাওয়া গভীর উদ্বেগের। কারণ এর মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে পরোক্ষভাবে সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের শিক্ষক নিয়োগে জটিলতাকেও চুক্তি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার ফল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি, মানবাধিকার সুরক্ষা ও জাতীয় স্থিতির স্বার্থে সব রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে চুক্তি বাস্তবায়ন অগ্রাধিকার থাকা জরুরি বলে দাবি করেন নেতারা। তারা বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নে জাতীয় সংলাপ আয়োজন, কার্যকর রোডম্যাপ ঘোষণা ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সব রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে অগ্রাধিকার হিসাবে চুক্তি বাস্তবায়ন অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। তাহলে চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে-তা অল্প সময়ের মধ্যেই সমাধান হয়ে যাবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম চৌধুরী প্রমুখ।

Top