এ শোকের আগুন জ্বলবে কাল থেকে কালান্তরে,অশ্রুঝরা আগস্ট
মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া :সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার পর গোটা বিশ্বে নেমে আসে তীব্র শোকের ছায়া। ছড়িয়ে পড়ে ঘৃণার বিষবাষ্প।সে ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় দ্য টাইমস অব লন্ডনের ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট সংখ্যায় বলা হয়, ‘সবকিছু সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে সব সময় স্মরণ করা হবে। কারণ তাকে ছাড়া বাংলাদেশের বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই।একই দিন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় বলা হয়েছিল, ‘বাংলাদেশের লাখ লাখ লোক শেখ মুজিবের জঘন্য হত্যাকাণ্ডকে অপূরণীয় ক্ষতি হিসাবে বিবেচনা করবে।’ সেই শোকাবহ আগস্টের পঞ্চম দিন আজ।১৯৭৫ সালের ৫ আগস্ট ছিল মঙ্গলবার। দিনটি ছিল বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠপুত্র শেখ কামালের জন্মদিন। ১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের প্রধান লক্ষ্য বঙ্গবন্ধু হলেও এ দিনের ঘটনায় শেখ কামালই ছিলেন প্রথম শহিদ। বঙ্গবন্ধুর ছেলে পরিচয় দেওয়ার পর ঘাতক বজলুল হুদা স্টেনগান দিয়ে শেখ কামালকে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধু ভবনের আবাসিক ব্যক্তিগত সহকারী এবং হত্যা মামলার বাদী মোহিতুল ইসলামের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের বর্ণনায় জানা যায়, ‘তখন ভোর সাড়ে চারটা-পাঁচটা হবে। চারদিক ফরসা হয়ে গেছে। বাড়ির চারদিকে বৈদ্যুতিক আলোও জ্বলছিল। বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে তখন গোলাগুলি শুরু হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ পর গুলি বন্ধ হলে কাজের ছেলে আবদুল ওরফে সেলিম ওপর থেকে পাঞ্জাবি-চশমা এনে দিলে বঙ্গবন্ধু ওই পাঞ্জাবি চশমা পরে বারান্দায় এসে ‘আর্মি সেন্ট্রি, পুলিশ সেন্ট্রি এত গুলি হচ্ছে তোমরা কী কর’ বলে উপরে চলে যান। তারপর শেখ কামাল ওপর থেকে এসে বলেন ‘আর্মি ও পুলিশ ভাই আপনারা আমার সঙ্গে আসেন।’ তখন তিন-চারজন কালো খাকি পোশাকধারী সশস্ত্র আর্মি আসে। এর মধ্যে খাকি পোশাকধারী বজলুল হুদা শেখ কামালের পায়ে গুলি করে।
শেখ কামাল তখন শেখ মুজিবের ছেলে পরিচয় দিলে সঙ্গে সঙ্গে শেখ কামালকে বার্স্ট ফায়ার করে হত্যা করা হয়। এরপর একে একে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের সবাইকে।বঙ্গবন্ধু সব সময় বলতেন, ‘সাত কোটি বাঙালির ভালোবাসার কাঙাল আমি। আমি সব হারাতে পারি, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা হারাতে পারব না।’ কিন্তু ঘাতকের দল তার সেই প্রিয় বাঙালিদের কাছ থেকে, স্বপ্নের স্বাধীন প্রিয় বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল।কিন্তু শরীরী মুজিবকে হত্যা করলেও বাঙালির হৃদয় থেকে প্রিয় পিতাকে মুছে ফেলতে পারেনি তারা। তাই আজও শ্রাবণের বৃষ্টি, সবুজ মাঠের সীমনা, নদীর পাড়ঘেঁষে সমুদ্রের জল, গাছের পাতারাও শোকে ঝরছে অবিরল।বছর ঘুরে রক্তের কালিতে লেখা সেই দিন-রাত বাংলায় বারবার ফিরে আসে। নদীর স্রোতের মতো চিরবহমান কাল থেকে কালান্তরে জ্বলবে এ শোকের আগুন। কবির ভাষায়-“আপনাকে তো নিয়েছে ওই ঘাসের নরম/কোল, জ্যোৎস্নার কিছু শিশির প্রতি ভোরে/বাঁচিয়ে রাখে বাংলার রূপ, আপনি/অন্য মনে আছেন বলে আমরা/বলি, শেখ মুজিব ঘুমিয়ে আছেন/টুঙ্গিপাড়ায়;/বঙ্গবন্ধু, আপনার যখন সময় হবে/এসে ডাক দেবেন, সবাই আছে,/সোনার বাংলার স্বপ্নও আছে,/আছে কোটি কোটি জনতা,/‘ভায়েরা আমার’ বলে ডাকলেই/আমরা জয়ধ্বনি দিয়ে বলব,/জয় মুজিব, জয় বঙ্গবন্ধু, জয় বাংলা।