প্রথমবারের মতো ওয়ানডে সিরিজও নিজেদের করে নেয় টাইগাররা
মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া :৩৪তম ওভারে নাথান এলিসের একটি বাউন্সারে আঘাত পেয়ে মাঠের বাইরে চলে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল মেহেদী হাসান মিরাজকে নিয়ে।মিরাজের সেই ছক্কাতেই জয় নিশ্চিত হয় বাংলাদেশের।সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে সিরিজও নিজেদের করে নেয় টাইগাররা।বৃহস্পতিবার মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টস জিতে আগে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় অস্ট্রেলিয়া। চিকিৎসকদের শুশ্রূষার পর অবশ্য আবারও ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে যান বাংলাদেশের অধিনায়ক।এরপর ম্যাচের সমাপ্তিটাও করেন নিজের মতো করেই।রাইলি মেরেডিথের ১৪৩ কিলোমিটার গতির একটি শর্ট বল পেয়ে দুর্দান্ত এক হুক শট খেলেন মিরাজ।বল উড়ে যায় ফাইন লেগ সীমানার অনেক ওপারে।
কিন্তু শুরু থেকেই তাসকিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমানের বোলিংয়ে চাপে পড়ে সফরকারীরা। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে বড় সংগ্রহ গড়তে পারেনি তারা।শেষ পর্যন্ত বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে বাংলাদেশের সামনে ১৯২ রানের লক্ষ্য দাঁড় করায় অস্ট্রেলিয়া। সেই লক্ষ্য ৩৬ বল হাতে রেখেই পেরিয়ে যায় বাংলাদেশ। ৫ উইকেটের জয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই প্রথমবারের মতো অজিদের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ নিশ্চিত করে টাইগাররা।
ওয়ানডে ক্রিকেটে সিরিজ জয় বাংলাদেশের জন্য এখন আর বিরল কোনো ঘটনা নয়। ২০১৫ বিশ্বকাপের পর থেকে একের পর এক শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারিয়ে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে টাইগাররা। তবে আক্ষেপ থেকে গিয়েছিল..ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কখনো ওয়ানডে সিরিজ জেতা হয়নি বাংলাদেশের।দীর্ঘ অপেক্ষার পর অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে সেই আক্ষেপও ঘুচল মিরপুরে। এখন বাকি রইল শুধু ইংল্যান্ড।বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে টানা চারটি ওয়ানডে সিরিজ জয় নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। অধিনায়ক হিসেবে মাশরাফি সবচেয়ে বেশি ৬টি সিরিজ জিতেছেন। তামিম জিতেছিলেন ৫টি। আর মেহেদী সেই তালিকার তিন নম্বরে আছেন।
গত এক দশকে তাও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তো দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলার সুযোগই এসেছে ১৬ বছর পর! এই সিরিজের আগে ২২টি আন্তর্জাতিক ওয়ানডে খেলেছে বাংলাদেশ। যার মধ্যে কেবল দুটি ওয়ানডে সিরিজ খেলেছে দুই দল। ২০০৬ সালে দুই ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের পর ২০১১ সালে সাকিবের নেতৃত্বে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলতে বাংলাদেশে এসেছিল অস্ট্রেলিয়া।বাংলাদেশের সামনে উপলক্ষটাকে রাঙানোর সুযোগ চলে আসে তিন ওয়ানডের সিরিজের প্রথম ম্যাচটি জেতায়। বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় ম্যাচে অজিদের উড়িয়ে দিয়ে সিরিজ নিশ্চিত করে নিল বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচটা জিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২১ বছর না জেতার আক্ষেপও শেষ হয়েছে বাংলাদেশের। আর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জিতে টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ না জেতার আক্ষেপটাই কেবল থাকল!
এদিন টস জিতে ব্যাট করতে নেমে অস্ট্রেলিয়া ৪২ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ১৮৭ রান সংগ্রহ করে। এরপর বৃষ্টি নামলে খেলা বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় তিন ঘণ্টা পর যখন খেলা শুরু হয়, তখন ম্যাচের দৈর্ঘ্য কমিয়ে দিতে বাধ্য হন ম্যাচ রেফারি। ৪২ ওভারে বাংলাদেশের লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৯২।বৃষ্টির পর এই লক্ষ্যটা যে সহজ ছিল না, সেটি বাংলাদেশের শুরুর অসহায়ত্ব দেখলেই বোঝা যায়। অজি দুই পেসার জেভিয়ার বার্টলেট ও ন্যাথান এলিস মিলে বাংলাদেশের টপ অর্ডারকে চাপে ফেলে দেন। প্রথম ওভারেই বার্টলেট তানজিদ তামিমকে শূন্য রানে ফিরিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে ভয় ঢুকিয়ে দেন। তবে দ্বিতীয় উইকেটে সৌম্য সরকার ও নাজমুল হোসেন শান্ত চাপ সামলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তাদের ৮৫ রানের জুটি বাংলাদেশকে চাপমুক্ত করে।
কিন্তু হুট করেই অনিয়মিত স্পিনার ম্যাট রেনশর ঘূর্ণিজাদুর কাছে পরাস্ত হন সৌম্য। বাঁহাতি এই ব্যাটার প্যাডল সুইপ খেলতে গিয়ে বলের লাইনের ভেতরে যেতে পারেননি। ফলে ব্যাটের আগায় লেগে বল চলে যায় স্লিপে, যেখানে সহজ ক্যাচ নেন বার্টলেট। সঙ্গীকে হারিয়ে ১২ রানের মধ্যে ফিরে যান শান্তও। দুজনই ৪২ রানের গুরুত্বপূর্ণ দুটি ইনিংস খেলেছেন।
এরপর লিটন ও তাওহীদ মিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেন। তবে বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি এই জুটি। ২৪ রানের জুটি হতেই লিটন ফেরেন গ্রিনের বলে। লিটনকে হারানোর পর প্রত্যাশা ছিল মোসাদ্দেক হয়তো ম্যাচ শেষ করেই মাঠ ছাড়বেন। আগের ম্যাচে তার অলরাউন্ড পারফরম্যান্সেই ম্যাচ জিতেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু আজ ১৪ বলে ১৫ রান করে আউট হয়েছেন।
মোসাদ্দেকের আউটের পর দুশ্চিন্তা তৈরি হয়। ছন্দহীন অধিনায়ক মিরাজ কি পারবেন তাওহীদকে নিয়ে ম্যাচ জেতাতে? একাদশে এর পরে আর কোনো ব্যাটার নেই। তবে সবাইকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে তাওহীদ ও মিরাজের অবিচ্ছিন্ন জুটিই ইতিহাস তৈরি করে ফেলে। ৪৯ বলে ৫১ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন তারা। তাওহীদ ৫৫ বলে ৪০ এবং মিরাজ ২২ বলে ২২ রানের ইনিংস খেলে অপরাজিত থাকেন।সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতেও টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর শুরুতেই বাংলাদেশের পেস আক্রমণের তোপে পড়ে রীতিমতো বিপর্যস্ত হয় সফরকারীরা। তাসকিন আহমেদ ও মুস্তাফিজুর রহমানের আগুনঝরা বোলিংয়ে শূন্য রানেই তিন উইকেট হারিয়ে বসে অস্ট্রেলিয়া। ওয়ানডে ইতিহাসে শূন্য রানে তিন উইকেট হারানোর ঘটনা খুব বেশি দেখা যায় না।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এটি মাত্র চতুর্থ ঘটনা। এর আগে দুইবার পাকিস্তান এবং একবার বাংলাদেশ এমন বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিল। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো অস্ট্রেলিয়া।মাত্র দুই ওভারেই শূন্য রানে তিন উইকেট হারিয়ে চরম বিপদে পড়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশের পেসারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে রান তোলাও কঠিন হয়ে পড়ে সফরকারীদের জন্য। এরপর জশ ইংলিস ও অ্যালেক্স কেয়ারি মিলে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু দলীয় ২৫ রানের মাথায় মুস্তাফিজের তৃতীয় শিকার হন কেয়ারি।২৫ রানে চার উইকেট হারানোর পর ইংলিস ও ক্যামেরন গ্রিন দেখে-শুনে খেলে দলকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ৫৯ বলে ৪৩ রানের জুটির পর ইংলিসকে ফেরান তানভীর। তানভীরের বলে বিদায় নেওয়ার আগে ৩৮ বলে ৩৪ রানের দায়িত্বশীল ইনিংস খেলেন তিনি। সঙ্গীকে হারিয়ে দ্রুত বিদায় নেন গ্রিনও (২৫)। একেবারে অপ্রয়োজনীয় শটে রিটার্ন ক্যাচ দেন গ্রিন।
গ্রিনের বিদায়ের পর উইকেটে জমে যান মার্নাস লাবুশেন ও বার্টলেট। দুজনে মিলে দারুণ প্রতিরোধ গড়েন। ৬ উইকেটে ৮১ রান থেকে তারা দলকে নিয়ে যান ৭ উইকেটে ১৮৪ রানে। দুইজনের ১০৩ রানের কার্যকর জুটিতে লড়াই করার মতো পুঁজি পেয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। ৪২ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ১৮৭ রান তোলার পর বৃষ্টি নামে। সেই বৃষ্টিতে প্রায় তিন ঘণ্টা খেলা বন্ধ থাকে। যখন খেলা শুরু হয়, তখন বৃষ্টি আইনে বাংলাদেশের জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় ৪২ ওভারে ১৯২ রান। বার্টলেট ৫২ রানে আউট হলেও লাবুশেন ৫৫ রানে অপরাজিত ছিলেন।
বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে নতুন বলে দারুণ বোলিং করে অস্ট্রেলিয়াকে চমকে দেন মুস্তাফিজ।২৭ রান খরচায় ৩ উইকেট শিকার করে ম্যাচসেরা হন তিনি।এছাড়া তাসকিনও দারুণ বোলিং করেছেন। এক ওভারে জোড়া উইকেট তুলে নিয়ে তিনিও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে ভূমিকা রাখেন।আগের ম্যাচের মতো এই ম্যাচেও প্রথম ওভারে উইকেট শিকার করেন তিনি। তার শিকার তিনটি উইকেট। এছাড়া তানভীর শিকার করেন দুটি উইকেট।