পাসপোর্ট দালালদের আশা ভেস্তে গেল
মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া:পাসপোর্ট অফিসে অর্থের বিনিময়ে সহায়তাকারী বা এজেন্ট নিয়োগের সিদ্ধান্ত থেকে অবশেষে সরে এসেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।তবে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা পাসপোর্ট অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলদের কারও আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাসপোর্ট অধিদপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন,এজেন্ট নিয়োগের বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেই আপাতত স্থগিত রাখতে বলা হয়েছে। পরে হয়তো এ বিষয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত গণমাধ্যমে জানানো হবে। এজেন্ট নিয়োগের নামে দালালদের বৈধতা দেওয়া হচ্ছে বলে তুমুল সমালোচনার মুখে আপাতত বিষয়টি আর বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের অবস্থান মৌখিকভাবে পাসপোর্ট অধিদপ্তরকে (ডিআইপি) জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র বৃহস্পতিবার বিষয়টি নিশ্চিত করে।
সূত্র বলছে, সালাহউদ্দিন আহমদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বিভিন্ন দপ্তরের সেবা খাতে জনভোগান্তি লাঘবের নির্দেশ দেন। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পেন্ডিং কাজও দ্রুত সময়ে সম্পন্ন করতে বলেন তিনি। মূলত এরপরই আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া পাসপোর্ট এজেন্ট নিয়োগের বিষয়টি সামনে আসে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন মন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ (ডিজি) উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যান। এ সময় পাসপোর্টে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ এবং সেবা সহজীকরণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পরে মন্ত্রণালয় থেকে পাসপোর্ট সহায়তাকারী বা এজেন্ট নিয়োগ সংক্রান্ত উদ্যোগের হালনাগাদ অবস্থা জানতে চাওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাসপোর্ট অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন,এ সংক্রান্ত ফাইল ঘেঁটে দেখা যায় আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বেশ কয়েকবার এজেন্ট নিয়োগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে শেষ পর্যন্ত সেটি আর বাস্তবায়ন করে যেতে পারেনি। এরপর জুলাই আন্দোলনসহ রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিষয়টি দীর্ঘদিন আটকে ছিল।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ মোতাবেক এজেন্ট নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরুর আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে পাসপোর্ট অধিদপ্তর। এক্ষেত্রে পূর্ববর্তী একটি পরিপত্রের সূত্র উল্লেখ করে এ বিষয়ে আপত্তি জানায় অর্থ মন্ত্রণালয়। বিদ্যমান আইনে এভাবে এজেন্ট নিয়োগের কোনো সুযোগ নেই বলেও জানানো হয়। তবে চাইলে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে জনবল নিয়োগ করা যেতে পারে।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যমান আউটসোর্সিং কাঠামোয় এজেন্ট নিয়োগ দিতে গেলে শুধু ঢাকাতেই অন্তত ১০০ জন জনবল প্রয়োজন। এছাড়া সারা দেশে এ সংখ্যা হবে দেড় থেকে দুই হাজারের বেশি।এর সঙ্গে তাদের দৈনিক মজুরি ছাড়াও চেয়ার, টেবিল, কম্পিউটার, প্রিন্টার ও বিদ্যুৎ সংযোগে শতকোটি টাকারও বেশি খরচ হবে। অথচ এক্ষেত্রে তেমন সুফল নাও আসতে পারে। বরং ভূমি অফিসের উমেদারদের মতো পাসপোর্ট দালালরাও নিবন্ধিত এজেন্ট হিসাবে অফিশিয়ালি কাজ করার বৈধতা পাবেন। এতে পাসপোর্ট সেবায় বিদ্যমান ঘুস বাণিজ্য এবং জনভোগান্তি আরও কয়েকগুণ বাড়বে। সরকারি বিভিন্ন অফিসের উমেদারদের মতো তারাও হয়ে যাবেন পাসপোর্ট কর্মকর্তাদের অন্যতম ঘুসের ক্যারিয়ার।
সূত্র জানায়, এসব বিষয় তুলে ধরে বুধবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক ব্রিফ করা হলে মন্ত্রীও একমত পোষণ করেন। এ সময় তিনি এজেন্ট নিয়োগের প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন। তবে পাসপোর্টের বিদ্যমান জনভোগান্তি লাঘব এবং দুর্নীতি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণসহ অধিদপ্তরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এদিকে এজেন্ট নিয়োগের সিদ্ধান্ত স্থগিতের খবরে কতিপয় অসাধু রাজনৈতিক নেতা এবং দালালচক্রের সদস্যরা রীতিমতো ক্ষুব্ধ। তারা এখন এজেন্ট নিয়োগের উদ্যোগ বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভিন্নপথে চাপ দিচ্ছেন। কারণ, এজেন্ট নিয়োগের আশ্বাসে ইতোমধ্যে দালালচক্রের সদস্যরা বহু বেকার যুবকের কাছ থেকে অগ্রিম হিসাবে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এজেন্ট নিয়োগের বদলে পাসপোর্টের বিদ্যমান আবেদন পদ্ধতি সহজ করা হলেই অন্তত ৫০ শতাংশ ভোগান্তি কমবে। এছাড়া যে কোনো মূল্যে পাসপোর্ট অফিসে ‘চ্যানেল’ নামে পরিচিত দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ঘুস বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে নতুন করে এজেন্ট নিয়োগের প্রয়োজন হবে না। যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে কোনো ধরনের ভোগান্তি ছাড়াই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নির্বিঘ্নে কাঙ্ক্ষিত পাসপোর্ট হাতে পাবেন নাগরিকরা।