ক্লিন ইমেজের মন্ত্রিসভা সময়ের দাবি - Alokitobarta
আজ : রবিবার, ১৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ক্লিন ইমেজের মন্ত্রিসভা সময়ের দাবি


মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া:দেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে প্যাটনের এই মন্তব্য উদাহরণ হতে পারে।কারণ এক-এগারোর সরকার তাকে খাদের গভীরে ফেলে দিয়েছিল।তারেক রহমানের নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করার জন্য এমন কোনো পদক্ষেপ নেই যা ওই সরকার গ্রহণ করেনি। শুধু তাই নয়, দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রচারে-প্রপাগান্ডায় বিএনপিকেও নাস্তানাবুদ করেছে। পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারও বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস করতে এর ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। ফলে জনমনে বিএনপি সম্পর্কেও তখন এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল। অথচ গত ১৭ বছরে দেখা গেল, বিএনপি ও তারেক রহমান সম্পর্কে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছিল তার বেশির ভাগই ছিল মিথ্যা ও বানোয়াট। তারেক রহমানের নামে দেশে-বিদেশে বড় অঙ্কের কোনো অর্থ বা সম্পদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির মিথ্যা মামলায় কারাগারে নেওয়ার কারণে তার জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছিল, যেটি তার মৃত্যুর পরে জনগণের শ্রদ্ধার্ঘ্যরে মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে আমেরিকার সেনাবাহিনীর বিখ্যাত জেনারেল প্যাটন বলতেন,একজন মানুষ এখন কতটা উপরে আছে তা দিয়ে আমি তার সাফল্য মাপি না।একদম নিচে পড়ে যাওয়ার পরে সে নিজেকে কতটা উপরে তুলতে পারে সেটাই আসল কথা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, সব বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র সামাল দিয়ে শেষ পর্যন্ত তারেক রহমান দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পেরেছেন। নিজেকে সংযত রেখে, পরিস্থিতি অনুকূলে নিয়ে পেরেছেন নির্বিঘ্নে দেশে ফিরতে। মানুষকে স্বপ্নও দেখিয়েছেন। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান।’ এতে মানুষ অনুপ্রাণিত হয়েছে। তার ওপর ভরসা রেখেছে। তাই শেষ পর্যন্ত একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে জয়লাভের মধ্য দিয়ে বিএনপিকে সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসতে পেরেছেন তিনি। বিএনপির সরকার ও মন্ত্রিসভা গঠন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

কিন্তু এই সরকারে কারা অন্তর্ভুক্ত হবেন তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে, মন্ত্রিসভায় কারা স্থান পাবেন-এ নিয়ে জনমনে কৌতূহলের শেষ নেই। অনেকেই বলছেন, ক্লিন বা স্বচ্ছ ইমেজের নেতাদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। কারণ গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে নতুন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। জনমনে তৈরি হয়েছে নতুন আকাঙ্ক্ষা। দেশের তরুণসমাজ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখেছে। তারা সমাজে এক ধরনের পরিবর্তন চাইছে। বলা হচ্ছে, স্বাধীনতার পরে গত ৫৪ বছরে সরকারগুলো যা যা করেছে, তা করে এখন আর পার পাওয়া যাবে না। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, তথ্য-প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে এখন আর কোনো কিছুই গোপন করা সম্ভব নয়। গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরে শেখ হাসিনা সরকার দেশি গণমাধ্যমে তার সরকারের দুর্নীতির চিত্র চাপা দিয়ে রাখতে পারলেও শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো মাধ্যমে মানুষ সেগুলো জেনেছে। তার সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের বিদেশে টাকা পাচারের খবরও গোপন রাখা যায়নি। অনেকেই মনে করেন, শেখ হাসিনা সরকার ওইদিনই নৈতিকভাবে শেষ হয়ে গেছে, যেদিন তিনি বলেছেন, তার বাসায় কাজ করেছে সেই পিওনও নাকি চারশ’ কোটি টাকার মালিক!

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তার সরকারের সাড়ে পনের বছরে একদিনের জন্যও নেতাকর্মী বা সরকার, কারও উদ্দেশে দুর্নীতি সম্পর্কে কঠোর কোনো বক্তব্য দেননি শেখ হাসিনা। গণমাধ্যমে ছিটেফোঁটা কোথাও ছাপা হলে বা কেউ বললে তিনি খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একই ‘মিথ্যা রেকর্ড’ বারবার বাজিয়ে শুনিয়েছেন। এতে মানুষ বিরক্ত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘তারা মেনে নিয়েছেন, কিন্তু মনে নেননি।’ ফলে শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদের তুলনায় দ্বিতীয় মেয়াদ এবং দ্বিতীয় মেয়াদের তুলনায় তৃতীয় মেয়াদে দুর্নীতি উত্তরোত্তর বেড়েছে। এক পর্যায়ে নেতাকর্মীরা এ বিষয়গুলোকে আর তোয়াক্কাই করেনি। সমাজের সর্বস্তরে হাসিনা সরকারের দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা থাকলেও প্রকাশ্যে কারও কিছু বলার সাহস হয়নি।

ব্রিটিশ লেখক জর্জ অরওয়েল একবার মন্তব্য করেছিলেন, রাজনীতিকদের ভাষা আমাদের নিত্যদিনের ভাষা থেকে ভিন্ন। তাদের কাজই হলো মিথ্যাকে সত্য বানানো। দরকার হলে দিনে-দুপুরে খুনকেও ‘সম্ম্নাজনক’ কাজ বলে প্রমাণ করে ছাড়া। এমনকি একদম শুদ্ধ বাতাসকেও তারা ভারী ওজনের জিনিস বানাতে পারেন। অরওয়েলের এই মন্তব্য অনেকটাই মিলে যায় গণ-অভ্যুত্থানের পতন হওয়া শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে। তিনি উন্নয়নের বয়ানের নিচে সবকিছুকে চাপা দিয়ে রাখতে চেয়েছেন। অথচ সরকার পতনের পরে সবকিছু জনমনে স্পষ্ট হয়েছে। এতে দলটি আপাতত রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে আশার কথা, নির্বাচনি ইশতেহারে এবার দুর্নীতি দমনকে অগ্রাধিকারের তালিকায় প্রথমে রেখেছেন তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দুর্নীতির সঙ্গে বিএনপি কোনো আপস করবে না। সমাজের সর্বস্তরে দুষ্টক্ষতের মতো ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার জন্য পদ্ধতিগত ও আইনের সংস্কারের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথাও বলেছেন তিনি। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি দেশ পরিচালনার কথাও বলেছেন। সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক এক নিবন্ধে বলেছেন, দেশে সততা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতা সবই এখন প্রায় বিলুপ্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেছেন, সরকারের অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ বাড়াতে না পারলে বেকারত্ব আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ার আহবান জানান তিনি।

বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রত্যাশা, এবার দক্ষতা ও সততার সমন্বয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান মন্ত্রিসভা গঠন করার উদ্যোগ নেবেন। মাও সেতুং বলেছেন, দক্ষতাহীন সততা মূল্যহীন, আবার সততাহীন দক্ষতা বিপজ্জনক। ইতোমধ্যে এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিএনপির প্রার্থী তালিকার শতকরা ৮৫ ভাগ উচ্চ শিক্ষিত। নির্বাচনে জয়লাভ করা এমপিদের মধ্যে শিক্ষিত, তরুণ ও প্রতিশ্রুতিশীল অনেক নেতা রয়েছেন। এদের দল ও দেশের প্রতি কমিটমেন্ট রয়েছে। মন্ত্রিসভায় নেওয়া হলে তারা ভালো করবেন বলে আলোচনা আছে। এছাড়া লন্ডন থেকে তারেক রহমানের সঙ্গে ঢাকায় ফিরে যেসব নেতা ও কর্মকর্তা বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করছেন তারাও সবাই উচ্চ শিক্ষিত। একই মানের নেতা ও কর্মকর্তা ঢাকায়ও আছেন; যারা গত ১৭ বছর ধরে নানা আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে টিকে ছিলেন। পাশাপাশি বিএনপির আগের সরকারের মন্ত্রিসভায়ও অনেক ক্লিন ইমেজের নেতা রয়েছেন। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই উভয় অংশের মধ্য থেকে সমন্বয় করে মন্ত্রিসভা গঠন করা হলে বিএনপির আগামী দিনের রাজনীতিতে টিকে থাকার শক্ত ভিত তৈরি হবে। আইরিশ-ব্রিটিশ দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ এডমন্ড বার্ক বলেছেন, দলের সততাই দলের উৎকর্ষতা বৃদ্ধি করে। শেখ হাসিনা সাড়ে পনেরো বছরে শুধু শাসনক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য যত ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন সেগুলোই নিয়েছেন। কোনো আদর্শের ধার তিনি ধারেননি। তবে বর্ণবাদবিরোধী ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নন্দিত মার্কিন নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বলেছেন, সত্যিকার নেতা আদর্শ খোঁজে না, সে আদর্শের জন্ম দেয়। তারেক রহমানকে এবার সেই আদর্শের পথিকৃৎ হবেন এমনটিই প্রত্যাশা সবার।

Top