নির্বাচন,রোজা ও ঈদের কারণে আগামীতে এ হার আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে - Alokitobarta
আজ : বুধবার, ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নির্বাচন,রোজা ও ঈদের কারণে আগামীতে এ হার আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে


মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন:আসন্ন জাতীয় নির্বাচন,রোজা ও ঈদের কারণে আগামীতে এ হার আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।এদিকে মূল্যস্ফীতির হার প্রত্যাশিত মাত্রায় বা ৬ শতাংশের মধ্যে নেমে না আসার কারণে নীতি সুদের হার কমাচ্ছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।এতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।মূল্যস্ফীতির হার প্রত্যাশিত মাত্রায় কমিয়ে আনতে টানা চার বছর ধরে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।তাতেও মূল্যস্ফীতির হার প্রত্যাশিত মাত্রায় নামেনি।কিছুটা কমে এখন আবার বাড়তে শুরু করেছে।এমন প্রেক্ষাপটে এ মাসের শেষদিকে আসছে নতুন মুদ্রানীতি।এবারের মুদ্রানীতিতে নীতি সুদের হার কমাবে কি না সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

সূত্র জানায়, ২০২০ সালে করোনার পর হঠাৎ চাহিদা বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতির হার বাড়তে থাকে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করলে শুরু হয় বৈশ্বিক মন্দা। এ মন্দার ঢেউ বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও জেঁকে বসে। বিশ্বে অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও মন্দার কারণে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যায়। মন্দা কেটে গেলে বৈশ্বিক অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অনেক দেশ মূল্যস্ফীতির জাঁতাকল থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো এ হারের ছোবল থেকে বেরোতে পারেনি। উলটো মূল্যস্ফীতির নিম্নমুখী প্রবণতা আরও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে ওঠে। এরপর থেকে অন্তর্বর্তী সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়ে এ হার কিছুটা কমাতে সক্ষম হয়। গত অক্টোবরে তা ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে আসে। এরপর থেকে পণ্যমূল্য বাড়ার কারণে আবার মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে। গত নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। গত ডিসেম্বরে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। নির্বাচনের কারণে অনুপাদনশীল খাতে টাকার প্রবাহ বাড়ার কারণে চলতি জানুয়ারি এ হার আরও বাড়তে পারে। আগামী ফেব্রুয়ারি নির্বাচন, রোজা ও ঈদের বাড়তি চাহিদার কারণেও মূল্যস্ফীতির হার বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

২০২২ সালে মন্দার ধকলে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতিতে লাগাম টানতে ২০২২-২৩ অর্থবছরের শুরু থেকে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করা শুরু হয়। এর পাশাপাশি মন্দার নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা করতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএম্এফ) থেকে ঋণ ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ গ্রহণ করে। ২০২৩ সালে ওই ঋণের একটি শর্ত ছিল মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতিকে ব্যবহার করতে হবে। অর্থাৎ ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে ও টাকার প্রবাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাদের আরও শর্ত ছিল মূল্যস্ফীতির হার সন্তোষজনক পর্যায়ে বা ৫ শতাংশের মধ্যে নেমে না আসা পর্যন্ত মুদ্রানীতিতে কঠোরতা রাখতে হবে। ঋণের আরও শর্ত ছিল জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন। এসব শর্ত বাস্তবায়নের ফলে মূল্যস্ফীতির হার লাগামহীন গতিতে বাড়তে থাকে। ২০২২ সালের আগস্টে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ অতিক্রমণ করে। এরপর দু-এক মাস কমে ৮ শতাংশের ঘরে নামে। কিন্তু পরে আবার তা ঊর্ধ্বমুখী হয়। কারণ সরকার একদিকে ডলার, জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে এবং ছাপানো টাকা বাজারে ছেড়ে মূল্যস্ফীতিকে ঊর্ধ্বমুখী করে। অন্যদিকে ঋণের সুদ বাড়িয়ে ও টাকার প্রবাহ কমিয়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণে আসেনি। উলটো আরও বেড়েছে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে মূল্যস্ফীতির হার কমাতে নানামুখী পদক্ষেপ নেয়। এর মধ্যে টাকা পাচার বন্ধ হয়। ডলারের বিপরীতে টাকার মানে কয়েক দফা বড় ধরনের অবমূল্যায়নের পর বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। ছাপানো টাকা বাজারে ছাড়া বন্ধ করে। সুদের হারকে আরও ঊর্ধ্বমুখী করে। এতে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমে। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি থাকায় পণ্যের দামে মাঝে মধ্যেই ঊর্ধ্বমুখী হয়। এতে মূল্যস্ফীতির পালে আবার হাওয়া লাগে।

গত জুলাইয়ে চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশাবাদ ব্যক্ত করেছিল, সেপ্টেম্বরের মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার ৬ শতাংশের মধ্যে নেমে আসবে। তখন নীতি সুদের হার কমানো হবে। কিন্তু সেপ্টেম্বরে তা প্রত্যাশিত মাত্রায় কমেনি। পরে বলা হয়, জানুয়ারিতে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় নীতি সুদের হার কিছুটা কমানো হবে। কিন্তু ডিসেম্বরেও এ হার না কমে, বরং আরও বেড়েছে। আগামীতে এ হার আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নীতি সুদের হার কমানো হবে কি না সে বিষয়ে এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

এদিকে মুদ্রানীতি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বৈঠকে ব্যবসায়ীরা ঋণের সুদের হার কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন। তারা বলেছেন, চড়া সুদ দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।

এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি রয়েছে। পণ্যের উৎপাদন, আমদানি ও বাজারে পণ্যের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকার পরও দাম বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমা ও আমদানি শুল্ক কমানোর পরও পণ্যের দাম না কমে, বরং আরও বেড়েছে। এসব কারণে মুদ্রানীতি বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপকরণ ব্যবহার করে মূল্যস্ফীতির হার আর কমানো সম্ভব নয়। এখন কমাতে হলে বাজার ব্যবস্থাপনা ঠিক করতে হবে। বাজারে সরকারের হস্তক্ষেপ করতে হবে। বাজার ব্যবস্থাপনাকে সঠিক পথে না এনে শুধু সুদের হার বাড়িয়ে টাকার প্রবাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতির হার কমানো যাবে না।

অথচ টানা চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণের জন্য সুদের হার বাড়ানো হলো। এতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কর্মসংস্থান কমেছে। অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অবশ্য আইএমএফ বলছে, অনেক দেশ মুদ্রানীতির উপকরণ ব্যবহার করে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণ করেছে। বাংলাদেশেও এটি সম্ভব।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, বাংলাদেশে বাজার ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জটিল। এখানে সিন্ডিকেটের কারসাজি রয়েছে। যে কারণে বাজারে অর্থনীতির নিয়ম চলে না। এজন্য মূল্যস্ফীতিও কমানো সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে ঋণের কিস্তি ছাড় করবে আইএমএফ। তারা নতুন সরকারকেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের কথা বলবে।

Top