সাংবাদিকদের পেশাগত ও শারীরিক নিরাপত্তার ঝুঁকি বর্তমান বিশ্বে স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় অন্তরায় - Alokitobarta
আজ : শনিবার, ৩১শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাংবাদিকদের পেশাগত ও শারীরিক নিরাপত্তার ঝুঁকি বর্তমান বিশ্বে স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় অন্তরায়


নিজস্ব প্রতিবেদক:সাংবাদিক সুরক্ষা পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভূইঁয়া বলেন,সাংবাদিকদের পেশাগত ও শারীরিক নিরাপত্তার ঝুঁকি বর্তমান বিশ্বে স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় অন্তরায়। বিশ্বজুড়ে এবং স্থানীয় প্রেক্ষাপটে সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা প্রতিনিয়ত বহুমুখী সহিংসতা, আইনি হয়রানি এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপের মুখোমুখি হচ্ছেন। সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশন এবং ইউনেস্কোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে সাংবাদিকতাকে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তাই সাংবাদিকদের এই চলমান নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলোকে মূলত কয়েকটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:

১. শারীরিক সহিংসতা ও জীবননাশের হুমকি:
• সরাসরি হামলা ও হত্যা: অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন তৈরি বা রাজনৈতিক সহিংসতা, বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা প্রায়ই শারীরিক আক্রমণের শিকার হন। সম্প্রতি সিলেটে হাসপাতালে সংবাদ সংগ্রহকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা এর একটি বাস্তব উদাহরণ।

• বিচারের সংস্কৃতিহীনতা (Impunity): বিশ্বব্যাপী সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৯০ শতাংশেরই কোনো সুষ্ঠু বিচার বা সমাধান হয় না, যা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করে।

২. আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক হয়রানি:
• মিথ্যা মামলা ও গ্রেপ্তার: অনেক সময় প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা সরকারি কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আইনি ব্যবস্থা, মানহানির মামলা বা বিভিন্ন আইনের অপব্যবহার করে গ্রেপ্তার ও আটক করার প্রবণতা দেখা যায়।

• তথ্য প্রাপ্তিতে বাধা ও সেন্সরশিপ: সরকারি বা গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পেশাগত কাজে প্রবেশাধিকার না দেওয়া এবং সংবাদ প্রকাশে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করা প্রতিদিনের ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৩. ডিজিটাল ও অনলাইন নিরাপত্তা ঝুঁকি:
• সাইবার বুলিং ও ট্রলিং: ইন্টারনেটে সত্য প্রকাশ করলে সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে প্রাতিষ্ঠানিক বা গোষ্ঠীগতভাবে অনলাইনে অপপ্রচার, হুমকি এবং চরিত্রহনন করা হয়।

• নারী সাংবাদিকদের নির্দিষ্ট ঝুঁকি: নারী সাংবাদিকরা অনলাইনে এবং অফলাইনে মাত্রাতিরিক্ত যৌন ও জেন্ডারভিত্তিক হয়রানি, ট্রলিং এবং হুমকির সম্মুখীন হন।

• ডক্সিং ও নজরদারি: ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করা (Doxing) এবং ডিজিটাল ডিভাইসে নজরদারির মাধ্যমে সাংবাদিকদের পেশাগত গোপনীয়তা ভঙ্গ করা হচ্ছে।

৪. আর্থিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ:
• চাকরির নিরাপত্তাহীনতা: অনেক সংবাদ সংস্থায় সঠিক ওয়েজবোর্ড বা আর্থিক নিরাপত্তা না থাকায় সাংবাদিকরা সবসময় এক ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে কাজ করেন।

• মানসিক ট্রমা ও বার্নআউট: ক্রমাগত হুমকি, সংঘাতপূর্ণ পরিবেশ এবং লাঞ্ছনার শিকার হওয়ার কারণে গণমাধ্যমকর্মীরা গুরুতর মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা ও ট্রমার মধ্য দিয়ে যান।

একটি স্বাধীন ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ (Fourth Estate) হিসেবে বিবেচনা করা হয়,যা আইনসভা,শাসনব্যবস্থা এবং বিচার বিভাগের পাশাপাশি রাষ্ট্রের ভারসাম্য রক্ষা করে।

গণমাধ্যমের এই ভূমিকার মূল বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

• সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা: গণমাধ্যম নীতিনির্ধারক ও ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিদের কাজের সমালোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ করে, ফলে স্বচ্ছতা বজায় থাকে।

• সঠিক তথ্য প্রদান: সাধারণ মানুষের কাছে নিরপেক্ষ, নির্ভুল ও সময়োপযোগী তথ্য পৌঁছে দেয়, যা নাগরিকদের সচেতন মতামত তৈরিতে সহায়তা করে।

• জনমতের প্রতিফলন: জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সমস্যা এবং ক্ষোভের কথা নীতিনির্ধারকদের সামনে তুলে ধরার সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে।

• ওয়াচডগ বা অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা: দুর্নীতি, অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহার উন্মোচন করে সমাজ ও রাষ্ট্রকে সঠিক পথে রাখতে সাহায্য করে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দেশে দেশে স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠন, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ বীমা ও সুরক্ষামূলক প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

Top