এত শিশুমৃত্যুর দায় কার,হাম কেড়ে নিল পাঁচশ প্রাণ - Alokitobarta
আজ : রবিবার, ২৪শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
রাব্বি-রাজার দাপটে তছনছ নিয়মনীতি,বিআইডব্লিউটিসিতে আধিপত্য বিস্তার এত শিশুমৃত্যুর দায় কার,হাম কেড়ে নিল পাঁচশ প্রাণ আলোচিত লতিফ হত্যায় জড়িত একজন আটক ডাঃ আশীষের অবহেলায় চিকিৎসক দম্পতির নবজাতকের মৃত্যুঃ তদন্ত কমিটি গঠন প্রকৌশলী গোলাম মোত্তাকিনের ঢাকা জেলা সার্কেলে রহস্যজনক পদায়ন নিয়ে তোলপাড় নিরব ঘাতক ! স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে, বিদেশে যাবার মিশনের জোর তদবির সাবেক ছাত্রলীগের নেতা আওয়ামী লীগের কোটায় চাকুরী পাওয়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়! তাদের এখন বিদেশে যাবার ... শত কোটি টাকার সম্পদ : নেপথ্যে অবৈধ অর্থ ও অদৃশ্য শক্তি আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সিন্ডিকেটের সদস্যরা বিএনপির মুখোশ পরে বিদেশে যাবার মিশনে! স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় ত... আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সিন্ডিকেটের সদস্যরা বিএনপির মুখোশ পরে বিদেশে যাবার মিশনে! স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় ত...

এত শিশুমৃত্যুর দায় কার,হাম কেড়ে নিল পাঁচশ প্রাণ


মু.এ বি সিদ্দীক ভুঁইয়া:ন্তর্বর্তী সরকার বিকল্প ব্যবস্থা না নিয়েই সেটি একেবারে বাতিল করে দেয়। এছাড়া তিন দফায় পেছায় টিকা ক্যাম্পেইন। আর জানুয়ারিতে সংক্রমণ শুরু হলেও ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার দ্রুত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আড়াই মাসে হামে পাঁচশ শিশুর মৃত্যু। অথচ এই মৃত্যু ঠেকানো যেত, যদি সময়মতো গণটিকা কার্যক্রম চলত। পরপর তিন সরকারের চরম অবহেলা এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সিদ্ধান্তহীনতার মূল্য দিতে হচ্ছে শত শত শিশুর প্রাণে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকার স্বাস্থ্য খাতের সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।অহাসপাতালগুলোতেও পর্যাপ্ত হাই ফ্লো অক্সিজেন, ভেন্টিলেটর, আইসিইউ, পিআইসিইউ, শয্যা ও আইসোলেশন নিশ্চিত করা যায়নি। স্বাস্থ্য খাতের এই ধারাবাহিক অবহেলার কারণেই দেশে হামে এত মৃত্যু বলে অভিযোগ জনস্বাস্থ্যবিদদের। সন্তান হারানো পরিবারগুলো বলছে, দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।জানা যায়, স্বাস্থ্য খাতে চতুর্থ ধাপের স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর প্রোগ্রাম (এইচএনপিএসপি) শেষ হয় ২০২৪-এর জুনে।পঞ্চম ধাপের কার্যক্রমের প্রস্তুতি চললেও নানা কারণ দেখিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার টিকা ক্রয়ের যথাযথ বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ না করেই সেটি বাতিল করে এবং ২ বছরের একটি কর্মসূচি হাতে নেয়। কিন্তু ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর আর টিকার জন্য অর্থ ছাড় করা হয়নি। ফলে পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে টিকা ক্রয় ও মজুতে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেয়।

জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ‘ইউনিসেফ’র দাবি, ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতায় সময়মতো গণটিকা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সংস্থাটি সরকারকে একাধিকবার সতর্কও করেছিল। কিন্তু তাতে কর্ণপাত করেনি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান দাবি করেন, ২০২৫ সালে হামের টিকার (রুটিন) অভাবে কোনো মানুষ ফিরে গেছেন বলে জানা যায় না। তাছাড়া গণটিকা ক্যাম্পেইন সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত ‘ইন্টার-এজেন্সি কো-অর্ডিনেশন কমিটি (আইসিসি)’ নিয়ে থাকে। যেখানে ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরাও থাকেন। ইউনিসেফ ‘হামের প্রাদুর্ভাব’ নিয়ে তেমন কিছুই জানায়নি।এর আগে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছিলেন, তারা টিকার সংকট ও হামের মৃত্যুর ঘটনায় কাজ করছেন। সে সময় এ ঘটনায় তদন্ত শুরু করার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার তিনিবলেন, ‘আমি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি প্রোগ্রামে দেশের বাইরে (সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়) আছি। টিকার বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। কাজ চলছে। আমি দেশে এসে অফিশিয়ালি জানাব।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার গণতান্ত্রিক। সবকিছুই হবে ট্রান্সপারেন্ট (স্বচ্ছ)। টিকা নিয়ে কী হয়েছিল সবকিছুই জানানো হবে।’

এদিকে অভিযোগ-পালটা অভিযোগের মধ্যে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে দুজন এবং উপসর্গে বাকিরা মারা যায়। একই সময়ে ৫৪ জন নিশ্চিত এবং ১২৬১ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট ৬৮ হাজার ৮৬৯ শিশু হামে আক্রান্ত ও ৪৯৯ জনের মৃত্যু হলো। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ৮৫ জন এবং উপসর্গ নিয়ে ৪১৪ জন মারা গেছে। চলতি বছর বিশ্বে এটি হামে সর্বোচ্চ মৃত্যু। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সুদান, দেশটিতে মারা গেছে ৩৭১ জন। তৃতীয় অবস্থানে থাকা পাকিস্তানে প্রাণ গেছে ৭১ জনের।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে ২৯ হাজার ১৮৬ জন ভর্তি হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামে ৯ হাজার ৮৫২ জন, রাজশাহীতে ৫ হাজার ৮৯৬ জন, বরিশালে ৫ হাজার ১৪২ জন, সিলেটে ৩ হাজার ১১০, খুলনায় ৪ হাজার ৬০৭ জন, ময়মনসিংহে ১ হাজার ৫৩৫ জন ও রংপুরে ১ হাজার ২১২ জন ভর্তি হয়েছেন। অন্যদিকে ঢাকা বিভাগে ২১০ জন (নিশ্চিত হাম ও উপসর্গ মিলে) মারা গেছে। এরপর রাজশাহী বিভাগে ৮১, চট্টগ্রামে ৫০, সিলেটে ৪৮, বরিশালে ৪৮, ময়মনসিংহে ৩৬, খুলনায় ২১ জন ও রংপুরে ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসংশ্লিষ্টরা জানান, দাতা সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ১৯৯৮ সালে স্বাস্থ্য খাতে সেক্টর প্রোগাম (এইচএনপিএসপি) শুরু হয়। ২০২২ সালে চতুর্থ সেক্টর প্রোগ্রামের মেয়াদ শেষ হয়। দেশের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ায় ২০২২-২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আগামীতে কোনো সেক্টর প্রোগ্রাম না করার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে চতুর্থ সেক্টর প্রোগ্রাম কর্মসূচির মেয়াদ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ায়। হাম-রুবেলার (এমআর) ক্যাম্পেইনের গণটিকা আনার আগেই চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতন হয়।

সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে দেশে ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সি শিশুদের হামের রুটিন টিকা দেওয়া হয়। ইপিআই সংশ্লিষ্টরা বলেন, দেশে কখনোই রুটিন টিকাদান ব্যাহত হয়নি। রুটিন কর্মসূচিতে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনতে প্রতি ৪ বছর অন্তর দেশব্যাপী হামের গণটিকা ক্যাম্পেইন করা হয়। ২০২০ সালের পর ২০২৪ সালে গণটিকা ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে হাম-রুবেলার রুটিন ও গণটিকা ক্যাম্পেইনের অর্থ সহায়তা দেয় বৈশ্বিক টিকা সরবরাহের আন্তর্জাতিক জোট ‘গ্যাভি’। সংস্থাটির অর্থায়নে ইউনিসেফ গণটিকা ক্রয় ও ক্যাম্পেইনে সহায়তা করে। এজন্য ইউনিসেফ ৩ শতাংশ অর্থ অপারেশনাল ব্যয় হিসাবে নিয়ে থাকে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেক্টর প্রোগ্রাম বাতিল করে ওপেন টেন্ডার পদ্ধতিতে রাজস্ব বাজেট থেকে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সময় নানা জটিলতায় সরকার তিন দফায় গণটিকা ক্যাম্পেইন পেছায়। এতে জানুয়ারিতে হামের সংক্রমণ শুরু হয়। ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার আসে। ১৫ মার্চ থেকে দেশব্যাপী হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, হামের গণটিকা সংগ্রহে আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৪ সালের ১৮ এপ্রিল ‘গ্যাভি’ বরাবর আবেদন করে। এরপর আওয়ামী লীগ জুলাই আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হয়। এদিকে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গ্যাভি ২৯ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে টিকা দেওয়ার কথা মৌখিকভাবে জানায়। ২০২৫ সালের ৭ মার্চ একটি ‘ডিসিশন লেটার’ও পাঠায়। চিঠিতে গণটিকার জন্য সিরিঞ্জ, স্যালাইন, সেফটি বক্স, টিকা পরিবহণে বিমান ভাড়াসহ বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশকে ক্যাম্পেইন বাবদ ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ বহনের কথা জানায়। টিকা ক্রয়ের জন্য ইউনিসেফের সাপ্লাই ডিভিশনকে প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ ৪৮ হাজার ২২৩ মার্কিন ডলার দেওয়া হয়। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় যা প্রায় ২২৮ কোটি টাকা। এছাড়া ক্যাম্পেইনটি সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে গ্যাভি ৮৯ লাখ ১৩ হাজার ৮৫ মার্কিন ডলার দেওয়ার কথা জানায়।জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বলেন,আওয়ামী লীগ সরকারের গণটিকা আনতে না পারা, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গণটিকা কার্যক্রম শুরু করতে না পারা এবং বর্তমান সরকার ‘জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা’ না দেওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।

Top