বিশেষ ঋণে ঈদে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিতে
মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া:শুধু সচল শিল্পপ্রতিষ্ঠান শ্রমিক-কর্মচারীদের গড়ে ৩ মাসের বেতন-ভাতার সমপরিমাণ অর্থ ঋণ নিতে পারবে। এই ঋণের সুদহার হবে বাজারভিত্তিক এবং তা সরাসরি শ্রমিকদের ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হবে।শিল্পমালিকরা সরাসরি ঋণের অর্থ পাবেন না। অন্যদিকে একই কারণে বকেয়া নগদ প্রণোদনার দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।আসন্ন ঈদে রপ্তানিমুখী শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে মালিকদের বিশেষ ঋণ সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সার্কুলার জারি করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এর আগে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির একটি প্রতিনিধিদল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে দেখা করে আসন্ন ঈদের আগে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা চায়। কেননা অনেক তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা বেতন-ভাতার দাবিতে আন্দোলন করছেন। ফলে শ্রমিক অসন্তোষ বেড়েছে। এ কারণে ঈদের আগে এ ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, গত ৭ মাস পোশাক রপ্তানিতে কমে গেছে। ফেব্রুয়ারি-মার্চেও কাজ কম হয়েছে। এ অবস্থায় অনেক কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে অসুবিধা হতে পারে, বিধায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ঋণ চাওয়া হয়েছে। কিন্তু এ ঋণ আদৌ কোনো শিল্পমালিক গ্রহণ করতে চান কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কেননা ঋণের সুদহার বাজারভিত্তিক রাখা হয়েছে। তাছাড়া যেসব শিল্পের সুনাম রয়েছে, তাদের এ ঋণের অর্থ প্রয়োজন পড়বে না।
সার্কুলারে বলা হয়, সচল রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীদের ফেব্রুয়ারির বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য চলতি মূলধন ঋণসীমার বাইরে প্রযোজ্যতা অনুসারে গ্রাহকের সক্ষমতা বিশ্লেষণপূর্বক মেয়াদি ঋণ সুবিধা প্রদান করা যেতে পারে। উক্ত ঋণ সুবিধার পরিমাণ ঋণগ্রহীতা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিগত ৩ মাসের প্রদত্ত গড় বেতন-ভাতার অধিক হবে না। ঋণের বিপরীতে বাজারভিত্তিক প্রচলিত সুদহার প্রযোজ্য হবে। তফসিলি ব্যাংকগুলো সংশ্লিষ্ট শ্রমিক-কর্মচারীর ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে সরাসরি ফেব্রুয়ারির বেতন-ভাতার অর্থ প্রদান করবে। ঋণের অর্থ মেয়াদি ঋণ আকারে ৩ মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১ বছরে সমকিস্তিতে মাসিক বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে আদায় করতে হবে।
এতে আরও বলা হয়, যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান মোট উৎপাদনের ন্যূনতম ৮০ শতাংশ রপ্তানি করে তারা রপ্তানিমুখী শিল্প এবং যেসব প্রতিষ্ঠান তাদের শ্রমিক-কর্মচারীদের নভেম্বর হতে জানুয়ারির বেতন পরিশোধ করেছে তারা সচল হিসাবে বিবেচিত হবে। সচল ও রপ্তানিমুখী হওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিত্বকারী বাণিজ্য সংগঠনের (বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ইত্যাদি) প্রত্যয়নপত্র দ্বারা সমর্থিত হতে হবে।
এ ধরনের ঋণের ওপর নিয়মিত সুদ ব্যতীত অন্য কোনো প্রকার অতিরিক্ত সুদ বা মুনাফা বা ফি কিংবা চার্জ (যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন) আদায় বা আরোপ করা যাবে না।
সার্কুলারে উদ্যোক্তাদের এ বিশেষ ঋণ সুবিধা প্রদানের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলা হয়, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়িক পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি ধারাবাহিক নিম্নমুখী রপ্তানি আয়, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, তারল্য সংকট ইত্যাদি কারণে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে ওই প্রতিষ্ঠানগুলো শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। এ কারণে উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রেখে রপ্তানির গতিধারা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থায়ন সহায়তা প্রদানের আবশ্যকতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে সচল রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা যথাসময়ে পরিশোধের মাধ্যমে রপ্তানি সক্ষমতা ও দেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধি অক্ষুণ্ন রাখার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অন্যদিকে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পের বকেয়া নগদ সহায়তার বিপরীতে দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৩য় কিস্তির প্রথম ধাপে এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং দ্বিতীয় ধাপে এক হাজার কোটি টাকাসহ সর্বমোট দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বিজিএমইএ বলেছে, পোশাক শিল্পের সংকটকালীন মুহূর্তে এই জরুরি ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। প্রণোদনার টাকা পেতে বিজিএমইএ তার সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজ নিজ লিয়েন ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে অনুরোধ জানাচ্ছি।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে পোশাকশিল্পের মালিকদের ওপর যখন শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বোনাস এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল পরিশোধের প্রবল চাপ তৈরি হয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে এই অর্থ বরাদ্দ শিল্পমালিকদের জন্য এক বড় স্বস্তি নিয়ে এসেছে।