তেল ও এলএনজি নিয়ে চিন্তায় সরকার
মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া:এলএনজি আমদানির ৬০ শতাংশই যে আসে কুয়েত থেকে! এ মাসে কুয়েত থেকে দুটি কার্গো বাতিল হয়েছে। এখন ওই এলএনজি স্পট মার্কেট থেকে কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। তবে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এপ্রিল ও মে মাসে আরও বড় বিপদে পড়বে বাংলাদেশ।মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশকে মারাত্মক গ্যাস সংকটের মুখে পড়তে হতে পারে। কুয়েতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রিফাইনারি বন্ধের পর এমনিতেই কপালে ভাঁজ পড়েছে।জ্বালানি তেল, এলএনজি ও এলপিজি পরিস্থিতি জানতে দুপুরে আবারও জ্বালানিমন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেই বৈঠকে যে কোনোভাবে তেল-গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন তিনি। সূত্রমতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে কোনো সরবরাহকারী তেল ও এলএনজির কার্গো বাতিল করলে বিকল্প বা অন্য উৎস থেকে তা সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কোনোভাবেই জনগণকে তেল ও গ্যাসের কষ্ট দেওয়া যাবে না।
দুপুর ১টার পর সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে এই বৈঠক হয়। বৈঠকের বিষয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এর আগে রোববার প্রধানমন্ত্রী তেল-গ্যাস সরবরাহ নিয়ে জ্বালানিমন্ত্রী এবং জ্বালানি বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি তখন মে পর্যন্ত জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এরপর সোমবার পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়। বিশেষ করে সৌদি আরবে আরামকোর রিফাইনারি এবং কুয়েতে রাজ এলএনজি রিফাইনারিতে হামলার পর ওই দুটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ওই দুই রিফাইনারি থেকে বাংলাদেশ তেল ও এলএনজি কিনে থাকে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। এতে ২ দিন ধরে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম।
সরকারি কর্মকর্তারা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তেল ও এলএনজি সংগ্রহের বিকল্প উৎসও তুলে ধরা হয়। জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, স্বভাবতই মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন। জনগণ যাতে তেল-গ্যাসের কোনো সংকটে না পড়েন সেজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।
বড় চিন্তা এলএনজি নিয়ে : প্রতিবছর দেশে ৭০ লাখ টনের মতো এলএনজি আমদানি করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু কুয়েত থেকে আমদানি করা হয় ৪০ লাখ টন। হামলার পর সোমবার কুয়েতের রাজ এলএনজি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এই মাসে (১৫ ও ১৮ মার্চ) সেখান থেকে দুটি কার্গো আসার কথা। এখন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তা সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক মঙ্গলবার বলেন, মার্চে ৯টি কার্গোর মধ্যে ৭টি নিশ্চিত করা হয়েছে। বাকি দুটি কুয়েতের স্পট মার্কেট থেকে কেনা হবে।
সূত্রমতে, গ্যাসে বড় বিপদ অপেক্ষা করছে এপ্রিল ও মে-তে। ওই দুই মাসে ১১টি করে কার্গো দেশে আসার কথা। মোট ২২ কার্গোর মধ্যে ১৮টি আসার কথা কুয়েত থেকে। এখন সেগুলোর কী হবে তা নিয়ে চিন্তিত সরকার। কুয়েত ওই সময়ে এলএনজি দিতে না পারলে স্পট মার্কেট থেকে সরকার কিনতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ হলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা কেউ বলতে পারছে না।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বলেছেন, কুয়েতকে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি দিতে বলা হয়েছে। তারা অনেক সময় অ্যাঙ্গোলা, অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে এলএনজি বাংলাদেশে সরবরাহ করে। সেখান থেকেও দিতে পারে। সূত্রমতে, দেশে এমনিতে গ্যাস সংকট চলছে। দৈনিক ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ করা হচ্ছে ২৬০ কোটি। এর মধ্যে আমদানি করা এলএনজিই ৯৫ কোটি ঘনফুট।
বাংলাদেশমুখী জাহাজ সৌদি আরবে আটকা : চলতি মাসে সৌদি আরব থেকে অপরিশোধিত তেল নিয়ে দুটি জাহাজ বাংলাদেশে আসার কথা। এরমধ্যে সৌদি রাস্তানোরা থেকে একটি জাহাজ অপরিশোধিত তেল লোড করা শেষ করেছে সোমবার। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় আটকে আছে সেই জাহাজ। এটি সময়মতো না এলে কিছুটা বিপদে পড়তে পারে বাংলাদেশ। ২২ মার্চ জেবেল দানা বা ফুজাইরা থেকে আরও একটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ বাংলাদেশে আসার কথা। সেটির কী হবে কেউ বলতে পারছে না। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অপরিশোধিত তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আনতে না পারলে অন্য বাজার থেকে সংগ্রহ করবে।
বছরে ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে সরবরাহ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। প্রাথমিকভাবে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ২৪ লাখ ২০ হাজার টন তেল কেনার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে উন্মুক্ত দরপত্রে ১২ লাখ টন এবং বাকি তেল আনা হচ্ছে সরকার টু সরকার (জিটুজি) চুক্তির মাধ্যমে। প্রতি মাসে ১৪ থেকে ১৫টি তেলবাহী জাহাজ বা পার্সেল আসে বাংলাদেশে। এর মধ্যে ২-৩টি অপরিশোধিত। বাকিগুলো পরিশোধিত। বিপিসির এক কর্মকর্তা জানান, এখন পর্যন্ত কোনো সরবরাহকারী কোনো পার্সেল বাতিল করেনি। তবে এপ্রিল ও মে মাসেও আর ২-৩টি করে অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ বাংলাদেশে আসার কথা। সেগুলোর বিষয়েও কেউ কিছু বলতে পারছে না। জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আগে মার্চ সামাল দেওয়া হচ্ছে। এরপর এপ্রিল-মে নিয়ে চিন্তা করা যাবে।
এদিকে, রান্নার গ্যাস এলপিজি এখন পর্যন্ত সরবরাহ ঠিক আছে। চলতি মাসে দেড় লাখ টন চাহিদা থাকলেও আমদানি করা হচ্ছে ১ লাখ ৯০ হাজার টন। আগামী মাসেও মোটামুটি এলপিজি আমদানির বুকিং আছে বলে জ্বালানি বিভাগকে জানিয়েছে অপারেটররা।
বড় অঙ্কের মাসুল দিতে হবে বাংলাদেশকে : সোম ও মঙ্গলবার দুদিনে পরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে ২২ ডলার। বিপিসির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগে ৮০ ডলারে এক ব্যারেল পরিশোধিত তেল পাওয়া যেত। এখন সেটি ১০০ ডলারের বেশি হয়ে গেছে। আগে একটি পার্সেল কিনতে দিতে হতো ২২ মিলিয়ন ডলার। এখন সেটি ২৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি। মধ্যপ্রাচ্যে যেভাবে রিফাইনারির ওপর হামলা হচ্ছে এতে তেলের দাম কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় কেউ জানে না। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর তেলের দাম ১৬৫ ডলারে ঠেকেছিল। বিপিসি জানায়, এখনকার দাম অনুযায়ী বাংলাদেশকে প্রতি মাসে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি বিল দিতে হবে জ্বালানি তেল কিনতে।
এলএনজির দামও হু হু করে বাড়ছে : যে এলএনজি রোববার ছিল ১০ দশমিক ৮ ডলার, সেটি মঙ্গলবার হয়েছে ১৮ ডলারের বেশি। এই দাম আরও বাড়বে। কারণ, এলএনজি বাজারের বেশির ভাগ সরবরাহ করত কাতার। সেই উৎস বন্ধ। সংশ্লিষ্টরা জানান, চীন মঙ্গলবার বলেছে, তারা আগে নিশ্চিত করবে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা। এতে তেল ও এলএনজির দাম বৃদ্ধি নিশ্চিত। কারণ, পৃথিবীর অন্যতম ভোক্তা হচ্ছে চীন।