নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু,গণ-অভ্যুত্থানের পর সুষ্ঠু নির্বাচন - Alokitobarta
আজ : রবিবার, ১৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু,গণ-অভ্যুত্থানের পর সুষ্ঠু নির্বাচন


মু.এবি সিদ্দীক ভুঁইয়া:বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। গণতন্ত্রের এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে আইনের শাসন ও মানবাধিকার। এক কথায় সরকারের শাসন ব্যবস্থা এমনভাবে দৃশ্যমান হতে হবে-যেন নিশ্চিতভাবে ‘জনগণের সরকার’ হিসাবে আখ্যা দেওয়া যায়। এর মধ্য দিয়ে প্রত্যাশিত গণতন্ত্রে ফেরাসহ নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরুর একটা বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে।এমনটিই মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।এ বিষয়ে কয়েকজন বিশ্লেষক বলেন,জাতির সামনে আসা এই সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। এজন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশপ্রেমের রাজনীতি গড়ে তুলতে হবে।তারা মনে করেন, নতুন এ যাত্রায় দেশকে এগিয়ে নিতে হলে বিএনপি সরকারকে হতে হবে গণমুখী, জবাবদিহিমূলক ও কল্যাণকামী। একই সঙ্গে অতীতের স্বৈরাচারী সরকারের মতো না হওয়ার বিষয়েও সতর্ক করে বিশ্লেষকরা বলেন, মানুষ এখন প্রশ্ন করা শিখে গেছে। সবার কাছে সামাজিকমাধ্যম আছে। তাদের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ভাষাও এখন কঠোর। ফলে ক্ষমতাসীন হয়ে অতীত ভুলে গেলে কিংবা জনগণ ও দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করলে তারা হলুদ কার্ড দেখাতেও সময় নেবে না। আর কেউ স্বৈরাচার হয়ে উঠতে চাইলে গণ-অভ্যুত্থানে শানিত এই জনতা লাল কার্ড দেখাতেও পিছু হটবে না।

সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেন,এটা একটা নতুন যাত্রা।অতীতের স্বৈরশাসনের পরিণতি আমরা দেখেছি। আমরা অবশ্যই আশা করব-যেন সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে মসৃণভাবে সামনের পথ পাড়ি দিতে পারি। তিনি আরও বলেন, স্বৈরশাসন কেন হয়েছিল, সেটার কারণগুলোও মনে রাখতে হবে। কারণ জবাবদিহির অভাব ছিল। সংসদ ঠিকমতো কাজ করত না। বিচার বিভাগকে প্রভাবিত করে রাখা হয়েছিল। এখন এগুলো যে রাতারাতি সব ঠিক হয়ে যাবে, এমনটা নয়। কিন্তু এগুলোর দিকে অবশ্যই নজর রাখতে হবে। আমরা চাইব-জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, জাতীয় সংসদ এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসহ সবকিছু যেন সুসংহত থাকে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের পর প্রথমদিনের যাত্রাটা খুব সুন্দর হয়েছে। বিএনপি বিজয় মিছিল বা সমাবেশ না করে দোয়া ও প্রার্থনার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এটা ভালো পদক্ষেপ ছিল। আমরা আশা করব-নতুন সরকার অতীতের তুলনায় অনেক বেশি জবাবদিহিমূলক হবে। তারা নাগরিকদের বাকস্বাধীনতার ব্যাপারে সচেতন থাকবে। আইনের শাসনের ব্যাপারেও নজর দেবে এবং কোনো ধরনের পক্ষপাত করবে না। এসব কিছুর একটা মূল্যায়ন নতুন সরকারের প্রথম ৬ মাসের মাথায় করা যাবে বলেও মন্তব্য করেন সুপ্রিমকোর্টের এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন,এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমাদের প্রত্যাশিত যে বাংলাদেশ, সেই পথে যাত্রা শুরুর একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটাকে এখন কতটুকু কাজে লাগানো যায় সেটাই দেখতে হবে। কারণ একটা বিষয় আছে, তা হলো-দুই-তৃতীয়াংশ মেজরিটি। এটা (দুই-তৃতীয়াংশ মেজরিটি) যখন হয়, অনেক সময় তা অভিশাপ হয়েও কাজ করে। ফলে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। অতীত থেকে আমাদের শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে চলতে হবে। যদিও কেউ অতীত থেকে শিক্ষা নিতে চায় না। কিন্তু না নিলে কি হয়, সেই উদাহরণও কিন্তু নিকট অতীতেই দেখা গেছে। ফলে এই সরকারকে অবশ্যই গণমুখী, কল্যাণকামী সরকার তথা জনগণের সরকার হতে হবে। নতুন সরকারের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে জানিয়ে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। কারণ আমাদের কোনো ব্যাপারেই ঐকমত্য নেই। আমরা একে অপরের সঙ্গে মিলে কাজ করতে পারি না। কিন্তু আমাদের সবাই মিলেই এগিয়ে যেতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা তথ্যপ্রযুক্তি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে কতটা অগ্রসর হলাম তার ওপর। আমাদের একটা বৈশ্বিক মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা রাজনীতির আখড়ায় পরিণত করে ফেলেছি। এগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। তরুণদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। কারণ যে সমাজে তরুণ বেশি সেখানে অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও বেশি। এই সুযোগ আমাদের নিতে হবে। এছাড়া দুর্নীতি আমাদের সর্বব্যাপী। এটার বিহিত করতেই হবে। সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করাসহ সবার জন্য মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

রাজনীতি বিশ্লেষক ডা.জাহেদ উর রহমান বলেন,আমরা একটা নতুন বাংলাদেশের দিকে যাচ্ছি। কারণ নির্বাচনের পরে ঝুঁকি থাকে সব পক্ষ নির্বাচনকে মেনে নিয়েছে কিনা? এখানে জামায়াতে ইসলামী কিছু সমালোচনা করলেও তা খুব বেশি সিগনিফিকেন্ট না। তারা নির্বাচন মেনে নিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। ফলে নতুন সরকার স্থিতিশীলতা পাবে। সংসদের ভেতর ও বাইরে জামায়াত ভালো এবং দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে। আর বিএনপির প্রতি আমি আস্থাশীল এ কারণে, আমি দেখেছি তারেক রহমান, যা যা করতে চান বা যেভাবে করতে চান, সেটা তিনি মন থেকেই চান। দুনিয়াতে কোথায় কি হচ্ছে, তিনি খোঁজখবর রাখেন। ফলে আমি বিশ্বাস করি, তিনি আসা মাত্রই নতুন কিছু করবেন। এছাড়া শক্তিশালী সরকারের জন্য যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দরকার ছিল সেটাও তারেক রহমান পেয়েছেন, যা জরুরি ছিল বলেও মনে করেন এই রাজনীতি বিশ্লেষক।

একই সঙ্গে নতুন সরকারকে ভবিষ্যৎ ঝুঁকির কথা মনে করিয়ে দিয়ে সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার পরামর্শ দেন ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, খুব বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই। আমাদের খুব কাছেই নেপালে তরুণরা আন্দোলন করে একটা বৈধ সরকারের পতন ঘটিয়েছে। ফলে তারেক রহমান যদি শুরু থেকেই অর্থনীতি ভালো করে বেকারত্ব দূর করতে না পারেন, সুশাসন যদি নিশ্চিত করতে না পারেন, দুর্নীতি যদি না কমাতে পারেন, তার দলের যেসব মানুষ অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত, সেগুলো যদি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন; তাহলে তার জন্য ঝুঁকি তৈরি হবে। তবে আমি বিশ্বাস করি, তিনি এগুলো করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে এখানে প্রধানত প্রয়োজন হচ্ছে, দল যেন তারেক রহমানের মেসেজটা বোঝেন। নেতাকর্মীরা যেন বুঝতে পারেন তারেক রহমান কি চান। সরকারকে সব সময় সঠিক পথে রাখতে নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যম সবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, এখন মানুষ অনেক বেশি সচেতন। এছাড়া নাগরিকদের হাতে সামাজিকমাধ্যম আছে। যে কোনো বিষয়ে তারাও যথেষ্ট শোরগোল করতে পারে।

রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, দেশ স্বাধীনের পর থেকেই নানা স্বার্থের অন্ধগলিতে মহান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নানা কারণে দেশের রাজনীতিতে ঘটে চরম অবক্ষয়। অর্থনীতি হয়ে পড়ে দুর্নীতিগ্রস্ত। মাফিয়াতন্ত্র এবং অলিগার্কদের উত্থানসহ সবই হয়েছে রাজনীতির মধ্য দিয়ে। এই ফাঁদে আটকে পড়েছিল পতিত সরকার প্রধান শেখ হাসিনা। তার শাসনামলে মানবাধিকার ও আইনের শাসন ছিল নির্বাসিত। ভিন্নমত দমনের আচরণ ছিল নিষ্ঠুরতায় ভরা। বেছে নেওয়া হতো খুন-গুমের মতো মানবতাবিরোধী পথ। মানুষ হারিয়েছিল ভোটের অধিকার। চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট ও দখলবাজিসহ দেশটা যেন মগের মুল্লুকে পরিণত হয়েছিল। এসব কিছুর বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতাসহ সাধারণ মানুষের চূড়ান্ত পদাঘাত ছিল চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান। তারা ভেঙে চুরমার করে দেয় স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার ভিত্তি। এরপর সেখান থেকে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করতে প্রয়োজন ছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের। বৃহস্পতিবার অভূতপূর্ব অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ এবং বহুল প্রত্যাশিত সেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে জনতার বিপুল সমর্থন পেয়ে সরকার গঠনের পথে বিএনপি।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এবারের সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন বাংলাদেশকে গণতন্ত্রে ফেরার বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচন নানা দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন রাজনীতিসংশ্লিষ্টরা। এছাড়া এ নির্বাচনে জেন-জি তথা তরুণ সমাজের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। তাদের বেশ কয়েকজন নির্বাচিত হয়েছেন। কয়েকজন হারলেও ভোটের ব্যবধান ছিল অনেক কম। এবারের নির্বাচনে ব্যাপক উপস্থিতি ছিল নারী ও তরুণ ভোটারের। এছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো প্রচারণার ক্ষেত্রে যে সহনশীলতা এবং ইতিবাচক প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করেছিল, ভোটের দিনও সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল, যা নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে উৎসাহিত করে। সবকিছু মিলিয়ে বহুল প্রত্যাশিত ও জনসম্পৃক্ত এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন এক বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সবাই।

Top