রিকশাচালক কর্মীর পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিলেন আমীরে জামায়াত
মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন : গত ৮ ফেব্রুয়ারি ইটনায় জামায়াতে ইসলামীর একটি নির্বাচনী জনসভায় যাওয়ার পথে স্ট্রোক করে মারা যান জামায়াতকর্মী শাহ আলম ভূঁইয়া (৫০)। পেশায় তিনি একজন রিকশাচালক ছিলেন। আজ তার বাড়ি গিয়ে পরিবার পরিজনকে সান্ত্বনা দেন এবং জামায়াতের উদ্যোগে পরিবারটির ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়ার ঘোষণা দেন।আজ রবিবার সকাল ১০টায় শাহ আলম ভূঁইয়ার গ্রামের বাড়ী শিমুলবাক যান জামায়াত আমির। তিনি প্রথম শাহ আলমের কবর জিয়ারত করেন, পরে পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করে কুশলাদি বিনিময় করেন এবং তাদের সান্ত্বনা দেন। এ সময় জামায়াত আমীর দলের পক্ষ থেকে শাহ আলমের পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন। এছাড়াও শাহ আলমের অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই মেয়ের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত পড়ালেখা থেকে শুরু করে সার্বিক দায়িত্ব গ্রহণের ঘোষণা দেন।
এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি যতদিন সংগঠনের দায়িত্বে আছি, ততদিন এই দায়িত্ব পালন করব। ভবিষ্যতে যারা দায়িত্বে আসবেন, তারাও তা পালন করবেন বলে আশা রাখি।এ সময় জামায়াতে ইসলামির আমির আরও বলেন, ‘এবার নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করতে গিয়ে আমি অনেক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি। শ্রমিক, কৃষক সাধারণ মানুষেরা আমাকে জড়িয়ে ধরেছেন। আমার নিজ নির্বাচনী ঢাকা-১৫ এলাকায় মাঝেমধ্যে যখন যেতাম, ছোট বাচ্চারা দৌঁড়িয়ে এসেছে। ওরা আমার পিঠে ঝুলেছে, গলায় ঝুলেছে, কাঁধে চড়েছে। আমার ভীষণ ভালো লেগেছে ওই দৃশ্যগুলো। শেষ পর্যন্ত সবাই মিলে ওরা আমাকে ‘দাদু’ খেতাব দিয়ে দিছে।শাহ আলম ভূঁইয়ার স্মৃতিচারণ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘একদিন আমার নির্বাচনীয় আসন ঢাকা-১৫ এর কাফরুল এলাকায় আমি ক্যাম্পেইন করছিলাম, পাশে কয়েকটা রিকশা সারি সারি দাঁড়ানো। মানুষের সাথে হাত মিলাচ্ছি, সালাম দিচ্ছি। হঠাৎ করে রিকশার হাতল ছেড়ে আমার বুকের ভেতরে ঝুঁকে গেলেন এক লোক। আমিও তাকে জড়িয়ে ধরে রাখলাম। তারপর বললাম আসেন। কয়েক দিন পর শুনলাম তিনি ইটনায় গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন জামায়াতের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা করার জন্য। এ সময় হার্টের এ্যাটাকে তিনি মারা যান।
জামায়াতের আমির বলেন, ‘দুই শ্রেণীর মানুষের সাথে মিশে দারুণ আনন্দ পাই।এক. ছোট বাচ্চারা।ওরা নিষ্পাপ।ওদের কোনো গুনাহ নেই। ওরা কাছে এলে মনে হয় আমি ফেরেশতাদের সাথে আছি। আরেকদল লোক কঠোর পরিশ্রম করে। দিন আনে দিন খায়। রক্ত পানি করে ঘাম ঝরায় পরিবারের মুখে হালাল খাবার তুলে দেয়ার জন্য। অনেক সময় সাদা ভদ্রলোক নামধারী লোকেরা একটু তাদেরকে এড়িয়ে চলে। তাদের গায়ের গন্ধ লেগে যায় কি না। তাদের গায়ে তো ঘাম লেগে থাকে। আমার কাছে এইটা ঘাম না। শতভাগ হালাল রুজির মানুষের গায়ের ঘাম আমার কাছে আতর।জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমি আজকে আমার ভাইয়ের পরিবারের কাছে এসেছি। তিনি আমাদের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ছিলেন। অতি সাধারণ মানুষ ছিলেন। ঢাকায় রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। তাকে সম্মান করা, তার পরিবারের খোঁজ-খবর নেয়া আমার ঈমানের অংশ, আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।এলাকাবাসীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘বিশাল হাওর আপনাদের সামনে। হাওর পাড়ের মানুষের মন বড় হয় এটা আমি জানি। প্রকৃতির সাথে আপনারা বেড়ে ওঠেন। এই বড় মনের মানুষগুলোর কাছে ছোট্ট একটা অনুরোধ থাকবে আমার, এই পরিবারটাকে আপনারা দেখে রাখবেন।
জামায়াত আমীর আরও বলেন, আমার দেশ ভাল নেই, বিভিন্ন জায়গায় অশান্তি, হিংসা হানাহানিতে জড়িয়ে গেছি, হিংসা দূর হোক, হানাহানি দূর হোক, অশান্তি দূর হোক, আমরা প্রত্যেকেই যেন প্রত্যেককে ভালবাসতে পারি। আমরা প্রত্যেককে প্রত্যেকেই যেন শ্রদ্ধা করতে পারি। কারণ আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, মানুষ তো সৃষ্টির সেরা। এখানে কে হিন্দু, কে মুসলিম, কে বৌদ্ধ, কে খ্রিস্টান এগুলো আল্লাহতায়ালা হিসাব নিবেন। এ দেশ আল্লাহর দান, আমরা কেউ দরখাস্ত করে মায়ের পেট থেকে পয়দা হয়নি। আল্লাহ যাকে যেখানে পছন্দ করেছেন সেখানেই পয়দা করেছেন।আমরা আমাদের দেশ নিয়ে অনেক সন্তুষ্ট। আমাদেরকে আল্লাহ শান্তি দিয়ে ভরপুর করে দিক।একই দিন, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আরেক কর্মী আব্দুস সালামের কবর জিয়ারত ও পরিবারের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ পর সংক্ষিপ্ত সমাবেশে প্রধান অথিতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
এসময় তিনি আরো বলেন, সবাই মায়ের জাতিকে সম্মান করবেন, এই নারী কারো মা, কারো স্ত্রী, কারো বোন, কারো মেয়ে। মায়ের পেটে যখন ২৮৫দিন ছিলাম, এক আউন্স অক্সিজেন মাকে ফিরিয়ে দিতে পারবোনা। এত ক্ষমতা আমাদের নাই, রক্তের একটা ফোঁটা প্রতিদান আমরা মাকে দিতে পারবো না। বুকের দুধের যে ফোঁটা দিয়েছে ঐ ফোটারও প্রতিদান দেওয়ার শক্তি আমাদের নাই। সেই মায়ের জাতির সাথে যারা সম্মানজনক আচরণ করবে,আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদের এবং জাতির সম্মান বাড়িয়ে দিবে। আপনি যেমন আপনার মাকে সম্মান করেন, তেমনি অন্য সন্তানের মাকেও সম্মান করবেন। আপনার মাকে যখন কেউ অসম্মান করবে, আপনার কলিজায় আঘাত লাগবে, অন্যের মাকেও যদি ঠিক তেমনি অন্যের মাকেও যদি আপনি অপমান করেন তার কলিজায় আঘাত লাগবে। এসময় তিনি কৃষকদের প্রতি বলেন,আমি কৃষকের সন্তান, আমি কৃষক এবং শ্রমিকদেরকে ভীষণ শ্রদ্ধা করি, কারণ আমি আমার বাবাকে শ্রদ্ধা করি, আমি যদি কৃষক শ্রমিককে শ্রদ্ধা করতে না পারি তাহলে আমি আমার বাবাকে অপমান করবো। আমার কারণে যাতে এই জাতির কখনো ক্ষতি না হয় সেজন্য সকলেই আমাকে দোয়া করবেন।উক্ত সমাবেশে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ সামিউল হক ফারুকী,বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্র শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন আইয়ুবী,কিশোরগঞ্জ জেলা আমীর অধ্যাপক রমজান আলী ,সাংবাদিক শামসুল আলম সেলিম, জেলা সেক্রেটারি মাওলানা নাজমুল ইসলাম ইসলামী ছাত্রশিবির কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সাবেক সভাপতি খালিদ হাসান জুম্মান, কিশোরগঞ্জ শহর আমীর আ ম ম আবদুল হক,মাও.আবদুর রাজ্জাক,বাজিতপুর জামায়াতের আমীর ইয়াকুত আলী,নিকলী উপজেলা জামায়াতের আমির আবুল হোসেন,সেক্রেটারি রফিকুল ইসলাম, উপজেলা ছাত্রশিবিরে সভাপতি খাইরুল ইসলাম বকুল,নিকলী উপজেলা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি হিমেল খান সহ জামায়াতের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও ছাত্র শিবিরের বিভিন্ন ইউনিটের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ স্থানীয় জনগণ উপস্থিত ছিলেন।
জামায়াতে ইসলামীর আমীর নিকলীর হাওড় অঞ্চলে আগমন উপলক্ষে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে নিয়ে এসেছিল ছাতিরচর এলাকা । বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নিকলী থানা পুলিশের বিভিন্ন টিম পৃথক পৃথক অবস্থান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। এ সময় নিকলী সেনা ক্যাম্পের মেজর মোঃআছিব, জেলা ডিএসবির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফ, বাজিতপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তৃপ্তি মন্ডল, থানার অফিসার ইনচার্জ রফিকুল ইসলামসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।উল্লেখ্য জামায়াতে ইসলামী কর্মী মোঃ আব্দুস সালাম(৬০) গত ৩ রা ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জ জেলা জামায়াত ইসলামী আয়োজিত কটিয়াদী উপজেলার কলেজ মাঠে এক নির্বাচনী জনসভায় অংশগ্রহণ করে বাড়ি ফেরার পথে বাজিতপুর উপজেলার উজানচর নামক স্থানে বাস দুর্ঘটনায় নিহত হয়।আজ রবিবার ১৫ ফেব্রুয়ারি সকাল দশটায় কিশোরগঞ্জের হাওড় উপজেলা ইটনার শিমুলবাক গ্রামে জামায়াতে ইসলামির কর্মী রিকশাচালক মরহুম শাহ আলম ভূঁইয়ার পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করতে যান।