নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা দেশের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন - Alokitobarta
আজ : রবিবার, ১৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা দেশের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন


জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক,আলোকিত বার্তা:দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চাপের পর নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা দেশের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন।

মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার মধ্যে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে এসেছে : বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ কি ফিরিয়ে আনা যাবে? বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকে অর্থ পাচারের যে অভিযোগ ও পরিসংখ্যান সামনে এসেছে, তা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা এখন কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকার নয়, বরং অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের অপরিহার্য শর্ত।

আওয়ামী লীগ শাসনামলে পাচারের চিত্র
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনামলে অর্থ পাচারের পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটেগ্রিটির একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে গড়ে প্রতি বছর আট থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে বিদেশে গিয়েছে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে মোট পাচারের পরিমাণ ৮০ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। দেশীয় বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক প্রতিবেদনে বলা হয় আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দেশকে দেশ থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছিল। আরেক দেশীয় গবেষণা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) একাধিক সময়ে জানিয়েছে, ব্যাংকিং খাতে জালিয়াতি, অতিমূল্যায়িত আমদানি বিল, ভুয়া রফতানি প্রণোদনা ও অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে অর্থ পাচার হয়েছে। আমদানি-রফতানির ইনভয়েস জালিয়াতি, যা ‘মিস-ইনভয়েসিং’ নামে পরিচিত; ছিল প্রধান কৌশল।

আলোচিত কেলেঙ্কারি ও অভিযুক্তদের নাম
পাচার ও ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনায় কয়েকটি নাম বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। ব্যাংক খাতের আলোচিত নামগুলোর মধ্যে অন্যতম চট্টগ্রামভিত্তিক বিতর্কিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলমের মালিকানাধীন এস আলম গ্রুপ। বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) বিভিন্ন অনুসন্ধান ও গণমাধ্যম প্রতিবেদনে অভিযোগ উঠেছে, এস আলম গ্রুপ ব্যাংকিং ব্যবস্থার অপব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যার আনুমানিক পরিমাণ সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা বলে আলোচনায় এসেছে। এ প্রসঙ্গে বিএফআইইউ একাধিক সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করে তদন্তের সুপারিশ করেছে। এ ছাড়া দুদকও কিছু ক্ষেত্রে অনুসন্ধান শুরু করেছে।

এস আলমের পরে হলমার্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান তানভীর মাহমুদ সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় দণ্ডিত হন। বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।পিকে হালদার নামে পরিচিত প্রশান্ত কুমার হালদার বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচারের অভিযোগে ভারতে গ্রেফতার হন। এ ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১১টি ব্যবসায়ী গ্রুপ ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের অর্থ পাচারের প্রমাণ পেয়েছে। ইতোমধ্যে দেশে বিদেশে থাকা তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করারও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট সন্দেহভাজন বড় ঋণখেলাপি ও অর্থপাচারকারীদের একটি তালিকা সংশ্লিষ্ট সংস্থায় পাঠিয়েছে বলে জানিয়েছে। যদিও পূর্ণাঙ্গ তালিকা সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয়নি, তবু আলোচিত নামগুলো গণমাধ্যমে এসেছে এবং তদন্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

অর্থনীতিতে প্রভাব
বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে, ডলারের দাম বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বাজার দরে। অর্থ পাচারের ফলে ব্যাংক খাতে তারল্য সঙ্কট, খেলাপি ঋণের পাহাড় এবং আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাচারকৃত অর্থের একটি বড় অংশ যদি ফিরিয়ে আনা যায়, তবে তা রিজার্ভ শক্তিশালী করতে, ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণে এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে কাজে লাগানো সম্ভব।

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস : কী পদক্ষেপ?
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর অর্থপাচার রোধ ও অর্থ উদ্ধারে কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

১. বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন : অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক ও এনবিআর সমন্বয়ে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়, যার লক্ষ্য বিদেশে পাচারকৃত সম্পদের তালিকা প্রণয়ন।

২. ২. আন্তর্জাতিক সহায়তা চাওয়া : যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর ও কানাডাসহ কয়েকটি দেশের সাথে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি সক্রিয় করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

৩. ৩. অফশোর হিসাব অনুসন্ধান : বিদেশী ব্যাংকিং তথ্য সংগ্রহে স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময় ব্যবস্থায় সক্রিয় অংশগ্রহণ জোরদার করা হয়েছে।

৪. ৪. দুদকের তদন্ত জোরদার : দুর্নীতি দমন কমিশন উচ্চ প্রোফাইল কয়েকটি মামলার তদন্ত পুনরুজ্জীবিত করেছে এবং কয়েকজন ব্যবসায়ী ও সাবেক কর্মকর্তার সম্পদ জব্দের আবেদন করেছে।

৫. ৫. সম্পদ ফ্রিজ ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া : ভারত ও সিঙ্গাপুরে জব্দকৃত কিছু সম্পদ দেশে ফেরত আনার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

৬. তবে বাস্তবে কত অর্থ ফেরত এসেছে, সে বিষয়ে সরকারি পরিসংখ্যান এখনো সীমিত। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সম্পদ শনাক্তকরণ থেকে চূড়ান্ত প্রত্যর্পণ পর্যন্ত দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া পেরোতে হয়।

৭. চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা

৮. পাচারকৃত অর্থ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শেল কোম্পানি, ট্রাস্ট বা তৃতীয় পক্ষের নামে রাখা হয়। ফলে প্রকৃত মালিক শনাক্ত করা কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশী আদালতের আদেশ প্রয়োজন হয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ তদন্ত ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সক্ষমতা ছাড়া এ প্রক্রিয়া এগোয় না।

৯. এ ছাড়া, দেশে আইনি সংস্কারও জরুরি। বিশেষজ্ঞরা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের কঠোর প্রয়োগ, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্তের ওপর জোর দিচ্ছেন।

১০. জনগণের প্রত্যাশা

১১. নতুন সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা, শুধু অর্থ ফেরত আনা নয়, বরং ভবিষ্যতে পাচার বন্ধের কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলা। অর্থনীতিবিদদের মতে, পাচার হওয়া অর্থের একটি অংশও যদি ফিরিয়ে আনা যায়, তা অর্থনীতিতে ইতিবাচক বার্তা দেবে। একই সাথে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হলে আস্থাও ফিরবে। ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনের পথে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের প্রশ্নটি এখন রাজনৈতিক অঙ্গীকারেরও পরীক্ষা। অর্থ ফেরত আনা যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো সরকার বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী রাষ্ট্রের সম্পদ বিদেশে সরিয়ে নিতে না পারে।

Top