২৫০ কোটি টাকার ফুলের বাজার ফেব্রুয়ারির তিন দিবসে
মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন:বাংলাদেশে এখন চলছে নির্বাচনে বিজয়ের উৎসবের বন্যা। আর এই উৎসবের মাঝেই এসে গেল বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ভ্যালেন্টাইন’স ডে।তরুণ-তরুণীদের জন্য অনন্য উৎসবের এ দিনটিতে ঋতুরাজ বসন্তবরণে আনন্দে মেতে উঠবেন তারা।বাসন্তী ও লাল রঙের শাড়িতে তরুণীরা সাজবেন বাহারি রঙের ফুল দিয়ে।ভালোবাসার মানুষকে দেবেন লাল গোলাপ।সেদিনও শহীদদের স্মরণে সবার হাতে থাকবে ফুল।এই তিন দিবস ঘিরে কৃষক পর্যায় থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে জমজমাট হয়ে উঠেছে ফুলের বাজার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই তিন দিবসগুলো ঘিরে প্রায় ২৫০ কোটি টাকার ফুলের বাণিজ্য হবে। পাশাপাশি নির্বাচনে জয়ী দলের নেতাদের বরণেও ফুল বিক্রি বাড়ছে।
বাহারি রঙের ফুলে ভরে উঠবে চারদিক। ছেলেরাও হলুদ পাঞ্জাবি পরে এ দিনটি বরণ করেন।অন্যদিকে আর সাতদিন পরই ২১ ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা’ দিবস।যশোর ফুল উৎপাদক ও বিপণন সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুর রহিম শুক্রবার বলেন,বসন্তবরণ, বিশ্ব ভালোবাসা ও মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে ইতোমধ্যে ফুল বাণিজ্য জমজমাট হয়ে উঠেছে। আবহাওয়া ভালো থাকায় এবার যশোর, সাভারসহ বিভিন্ন স্থানে ফুল উৎপাদন বেড়েছে। এসব জায়গা থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকাররা ফুল নিয়েছেন। এতে বিক্রিও বেড়েছে। তবে নির্বাচন ঘিরে মাঠ পর্যায়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যে ক্রেতারা আসেন,তাদের সংখ্যা কমেছে। তাই গত বছর তিন দিবস ঘিরে মাঠ পর্যায়, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে ৩০০ কোটি টাকার ফুল বেচা-বাণিজ্য হয়েছে। এবার কিছুটা কমে ২৫০ কোটি টাকার ফুল বাণিজ্য হবে বলে আশা করছি। নির্বাচনে জয়ী এমপি ও শপথের পর মন্ত্রীদের বরণ করতে ফুল বিক্রি বাড়বে। ফলে বিক্রি কিছুটা ভালো হবে বলে আশা করছি।
তিনি জানান, এই তিন দিবস সামনে রেখে যশোরে ১০০ কোটি টাকা লেনদেন হবে। পাশাপাশি সাভারের সাদুল্লাহপুর ইউনিয়নসহ বিভিন্ন স্থানে দিবসগুলোকে কেন্দ্র করে ৬০-৭০ কোটি টাকার ফুল বাণিজ্য হবে। বাকিটা রাজধানীর শাহবাগ, ফার্মগেট, আগারগাঁও ফুলের বাজারসহ দেশের অন্যান্য স্থান পূরণ করবে। এছাড়া ২৬ মার্চ ও ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখও আছে। তাই এ লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়বে বলে আশা করা যাচ্ছে।
যশোরের গদখালী ইউনিয়নের ফুলচাষি নাসরিন নাহার আশা বলেন, ফেব্রুয়ারিতে ফুলের কদর বেশি থাকে। তাই বিক্রিও বেশি হয়। এতে ফুলচাষিদের যে লাভ হয়, বছরের অন্য সময় হয় না। তবে যে দামে মাঠ থেকে আমরা ফুল বিক্রি করি, ক্রেতার কাছে খুচরা বাজারে তা দুই থেকে তিনগুণ দামে বিক্রি হয়। এতে লাভ যা করার, খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারা করেন। তিনি জানান, মাঠপর্যায়ে ভালোমানের প্রতি একশ গোলাপ ৯০০-১০০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। মাঝারি মানের ৭০০-৮০০ টাকা। ১০০ রজনিগন্ধা ৩০০-৪০০ টাকা। গ্লাডিওলাস ১০০ পিস বিক্রি হচ্ছে রংভেদে ৩০০ থেকে ১০০০ টাকা। জারবেরা ১০০ পিস ৫০০-১০০০, চন্দ্রমল্লিকা ১০০ পিস ২০০-২৫০, গাঁদাফুল প্রতি হাজার ২৫০-৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে মাঠ থেকে এই ফুল স্থানীয় পাইকারি বাজারে ১০০-২০০ টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে।
কথা হয় সাভারের সাদুল্লাহপুর ইউনিয়নের (গোলাপ গ্রাম) ফুলচাষি নাসিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রতিবছর আমরা এ সময়টার জন্য অপেক্ষায় থাকি। সাত দিন ধরে বিক্রি হচ্ছে। নির্বাচনের কারণে ক্রেতা আসতে পারেনি। মাঠ পর্যায়ে শেষ বাজার হয় ১২ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু এদিন ভোট ছিল। তাই বিক্রি কিছুটা কম হয়েছে।
সারা দেশের খুচরা বিক্রেতারা রাজধানীর শাহবাগ, ফার্মগেট ও আগারগাঁওয়ে ফুলের পাইকারি মার্কেট থেকে ফুল কিনে থাকেন। সপ্তাহের অন্য দিনের চেয়ে শুক্র ও শনিবার বিক্রি বেশি হয়। প্রতিদিন শুধু রাজধানীর পাইকারি বাজারে ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকার ফুল কেনাবেচা হয়। আর বিশেষ দিবস যেমন: পহেলা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবসে ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি বেশি হয়। শুক্রবার শাহবাগ ও আগারগাঁওয়ে ফুলের বাজারে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছরের তুলনায় এবার প্রতি পিস ফুলের দাম ৩০-৫০ টাকা বেশি। সেক্ষেত্রে মানভেদে একটি গোলাপ বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৫০ টাকায়। একটু ভালো মানের গোলাপ ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জারবেরা ৪০-৭০ টাকা, গাডিওলাস ৪০-৭০ ও রজনিগন্ধা ২০-৩০ টাকা দরে বেচাকেনা হচ্ছে। এছাড়া ৩৫০-৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এক হাজার গাঁদাফুল।
শাহাবাগ ফুলের বাজারে ফুল কিনতে আসা ন্যান্সি আক্তার বলেন, এবার ফুলের দাম অনেক। বিক্রেতারা একপ্রকার জিম্মি করে বেশি দামে ফুল বিক্রি করছে। অন্যান্য বাজারে তদারকি থাকলেও ফুলের বাজারে তদারকি নেই। তাই দিবস ঘিরে তারা ক্রেতাকে ঠকাচ্ছেন।
শাহবাগে ফুল বিক্রেতা মো. আনিসুল হক বলেন, দিবস ঘিরে ফুল বিক্রি এখন চাঙা। গত কয়েকদিন থেকে বিক্রি চলছে। শেষ সময় এখান থেকে ক্রেতা ও মৌসুমি বিক্রেতারাও ফুল কিনছেন। এছাড়া খুচরা ক্রেতারা কিছুদিন আগেই দিবসের ফুল সংগ্রহ করছেন। সব মিলে বিক্রি জমে উঠেছে। কালও (আজ) বিক্রি ভালো হবে বলে আশা করছি। পরিবহণ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় এবার ফুলের দাম একটু বেশি বলে জানান তিনি।