চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের মুদ্রানীতির প্রায় সব খাতেই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ
মোহাম্মাদ নাসির উদ্দিন :চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের মুদ্রানীতির প্রায় সব খাতেই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।মূল্যস্ফীতির হার না কমার কারণে এবারের মুদ্রানীতিতেও নীতি সুদের হার না কমানোর পক্ষে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কারণ নীতি সুদের হার কমানো হলে বাজারে টাকার প্রবাহ আরও বেড়ে যাবে। তখন মূল্যস্ফীতির হারও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।এমনিতেই নির্বাচন, রোজা ও ঈদের কারণে চাহিদা বেড়ে আগামীতে মূল্যস্ফীতির হার আরও কিছুটা বাড়তে পারে। এমন আশঙ্কায় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মুদ্রানীতির মৌলিক লক্ষ্যগুলোর মধ্যে টাকার প্রবাহ, অভ্যন্তরীণ ঋণ, বেসরকারি খাতে ঋণ, সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। মূল্যস্ফীতির হার কমানোর লক্ষ্যমাত্রা থেকেও বহু দূরে রয়েছে। তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় বৈদেশিক খাতে লক্ষ্যমাত্রার বেশি অর্জিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এমন প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি-জুন মেয়াদের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে এ মাসের শেষদিকে।
সূত্র জানায়, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে চলতি অর্থবছরসহ টানা চার বছর ধরে মুদ্রানীতিকে সংকোচনমুখী করা হয়েছে। বর্তমান গভর্নর ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নিয়ে তিন দফায় নীতি সুদের হার সাড়ে ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করেছেন। পণ্যমূল্যও কিছুটা কমেছে। ফলে মূল্যস্ফীতির হার সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ থেকে কমে গত অক্টোবরে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমেছিল। পণ্যমূল্য বাড়ায় ডিসেম্বরে আবার তা বেড়ে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে উঠেছে।মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতির হার কমানোর কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা হয়নি। তবে সরকার বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে সেটিই মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ছিল চলতি অর্থবছরে সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনবে। মুদ্রানীতি ঘোষণার পর একাধিকবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, মূল্যস্ফীতি সেপ্টেম্বর বা ডিসেম্বরের মধ্যে ৬ শতাংশে নেমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে তা নামেনি। যে কারণে নীতি সুদের হারও কমানোর পক্ষে নয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এদিকে আইএমএফও মুদ্রানীতিকে সংকোচনমুখী করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তারা বলেছে, মূল্যস্ফীতির হার সন্তোষজনক মাত্রায় না কমা পর্যন্ত মুদ্রানীতিকে কঠোর রাখতে হবে। অর্থাৎ নীতি সুদের হার কমানো যাবে না।কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর মেয়াদে দেশে টাকার প্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ। গত জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বেড়েছে ২ দশমিক ২০ শতাংশ। ব্যাংক খাতে গ্রাহকদের আমানত বাড়ার হার কম হওয়ায় টাকার প্রবাহ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বাড়েনি। যে কারণে ব্যাংকগুলোতে তারল্যের সংকটও কাটেনি। ফলে তারল্য বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিশেষ টাকার জোগান দিতে হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল।
সরকারি ও বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম বাড়ার কারণে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহও বেড়েছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশ কম। গত জুলাই-ডিসেম্বরে অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ শতাংশ। গত জুলাই-নভেম্বরে অর্জিত হয়েছে ৩ দশমিক ৯০ শতাংশ। জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ দশমিক ৪০ শতাংশ। নভেম্বর পর্যন্ত বেড়েছে ১৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরকারের অর্থ ব্যয় একেবারেই কম হওয়ার কারণে সরকারি খাতের ঋণ বাড়েনি। বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ জুলাই-ডিসেম্বরে বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২০ শতাংশ। নভেম্বর পর্যন্ত বেড়েছে দেড় শতাংশ। দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, গ্যাস, বিদ্যুতের সংকট, ব্যাংকে তারল্য সংকট, ঋণের চড়া সুদ এবং উদ্যোক্তাদের আস্থাহীনতার কারণে এ খাতে ঋণপ্রবাহ লক্ষ্যমাত্রার ধারেকাছেও যেতে পারেনি। ফলে দেশের অর্থনীতির গতি কমেছে। আলোচ্য খাতগুলোতে ডিসেম্বরের হিসাব চূড়ান্ত হলেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না।মুদ্রানীতিতে জুলাই-ডিসেম্বরে নিট বিদেশি সম্পদ অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ। জুলাই-নভেম্বরে অর্জিত হয়েছে ২৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ডিসেম্বরের হিসাবে এ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি অর্জিত হবে। নিট অভ্যন্তরীণ সম্পদ অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। জুলাই-নভেম্বর পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে ৫ দশমিক ৩২ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহ ও অন্যান্য খাতে সম্পদ বাড়ার কারণে নিট সম্পদ বেড়েছে।