ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বাণিজ্যে অস্থিরতা বাড়বে
মোহাম্মাদ মুরাদ হোসেন: আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) বলেছে, চলতি বছরে বৈশ্বিকভাবে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বাণিজ্যে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।এতে সরকারের ঋণ গ্রহণের হার বেড়ে গিয়ে বৈশ্বিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুদহার বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে চলতি বছরে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার আরও কিছুটা বাড়তে পারে, কমতে পারে মূল্যস্ফীতির হার। পাশাপাশি চলতি বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও ৭ শতাংশ কমতে পারে।এর প্রভাবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি কমতে পারে। বৈশ্বিক উত্তেজনার কারণে স্বল্পোন্নত দেশের সরকারগুলোর রাজস্ব আহরণে ঘাটতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সোমবার প্রকাশিত আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুট আপডেট, জানুয়ারি ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এবারের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ নিয়ে সরাসরি কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। প্রতিবেশী ভারতসহ বড় অর্থনীতির দেশগুলো নিয়ে প্রতিবেদনে তথ্য দেওয়া হয়েছে। আঞ্চলিকভাবে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের তথ্য দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন,বৈশ্বিকভাবে বাণিজ্যে অস্থিরতা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি কমে গেলে বাংলাদেশে অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।এর দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে দেশের রপ্তানি খাত। এমনিতেই দেশের রপ্তানি আয় কমবে। বৈশ্বিক বাণিজ্যে মন্দা থাকলে বাংলাদেশের বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এর দ্বারা রাজস্ব আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।ফলে সরকারকে বৈদেশিক ঋণের ওপর বেশি মাত্রায় নির্ভর করতে হতে পারে।বৈশ্বিক ঋণের সুদের হার বাড়লে দেশের খরচও বাড়বে।এমনিতেই দেশের আমদানির একটি বড় অংশই সম্পন্ন হচ্ছে বিদেশি ঋণ নিয়ে,যা পরে শোধ করা হচ্ছে। সুদের হার বাড়লে আমদানি ব্যয়ও বাড়বে।
আইএমএফ-এর প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষ্যে ওয়াশিংটনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক সংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বলা হয়, ভেনিজুয়েলা ও ইরান পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক উত্তেজনা বেড়েছে। তবে এখনো তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েনি। উত্তেজনার মধ্যেও ভেনিজুয়েলা জ্বালানি তেলের উৎপাদন বাড়িয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে।
আইএমএফ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৩.৩ শতাংশ হতে পারে। গত অক্টোবরে সংস্থাটি পূর্বাভাস দিয়েছিল, চলতি বছরে ৩ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে। বৈশ্বিকভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ায় এবং বড় অর্থনীতির দেশগুলো নীতি সুদের হার কমিয়ে অর্থনীতিকে আরও চাঙা করার পদক্ষেপ নেওয়ায় জানুয়ারিতে এসে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আরও দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ২০২৭ সালে সামান্য কমে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে।বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির হার গত বছর ছিল ৪ দশমিক ১ শতাংশ। চলতি বছরে তা কমে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে তা আরও কমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার বাড়লেও বাংলাদেশে কমছে। বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির হার কমলেও বাংলাদেশে এ হার সাম্প্রতিক সময়ে আবার বাড়তে শুরু করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন দেশ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানির ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের ফলে বৈশ্বিকভাবে বাণিজ্য উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। এটি বাণিজ্যে অনিশ্চয়তাকে আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যাপকতর অনিশ্চয়তা চলতি বছরজুড়ে থাকবে বলে আশঙ্কা করছে আইএমএফ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর বিশ্ব বাণিজ্য ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছিল। বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতার কারণে চলতি বছরে তা কমে ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে চলতি বছরজুড়ে বাণিজ্যে অস্থিরতার পর আগামী বছর অস্থিরতা বহুলাংশে কমে আসতে পারে। এতে ২০২৭ সালে বৈশ্বিক বাণিজ্য বেড়ে ফের ৩ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
আইএমএফ বলেছে, বাণিজ্যে অস্থিরতার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ ও দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক উত্তেজনাও বাড়ছে। পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। যার প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি অনিশ্চয়তার নতুন স্তরে চলে যেতে পারে; যা আর্থিক বাজার ব্যবস্থা, পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল এবং পণ্যের দামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এসব কর্মকাণ্ডের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতির অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।এতে বলা হয়, বৈশ্বিক মন্দার প্রভাবে অনেক দেশের সরকার রাজস্ব ঘাটতির মুখোমুখি হয়েছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে এ খাতে ঘাটতি আরও বাড়বে। তখন সরকারগুলোকে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে। সরকারগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি ঋণ গ্রহণ করে। তখন দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুদের হার বেড়ে যেতে পারে। যে হার এখন নিম্নমুখী। এ অবস্থার সৃষ্টি হলে আর্থিক অবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সংস্থাটি বলেছে, বৈশ্বিকভাবে এসব অনিশ্চয়তা দূর করা জরুরি। এজন্য দ্রুত তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা ও ব্যবসায়িক গতিশীলতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলেই টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে। এজন্য আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, অনিশ্চয়তা হ্রাস এবং দ্রুত কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।