আট হাজার কোটি টাকার প্রকল্প এখন গলার কাঁটা - Alokitobarta
আজ : বুধবার, ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ

আট হাজার কোটি টাকার প্রকল্প এখন গলার কাঁটা


মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া: সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহণে ৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প ৭ ফেব্রুয়ারি সরকারকে পুরোপরি বুঝিয়ে দেবে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন কোম্পানি লিমিটেড’ (সিপিপি)।কিন্তু এটি সঠিকভাবে বুঝে নেওয়ার মতো দক্ষ জনবল বাংলাদেশে নেই। এমনকি উদ্বেগের বিষয় হলো-সরকার উচ্চমানের কারিগরি প্রযুক্তিসম্পন্ন এ প্রকল্পের কাজ বুঝে নিতে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করলেও কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করতে পারেনি। এরপর সিপিপি ওই পাইপলাইনে কোনো ত্রুটি থাকলে মেরামত কিংবা দায়দায়িত্ব নেবে না। এ অবস্থায় ৮ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্প এখন সরকারের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশ্লিষ্টরা চিন্তিত।

এদিকে ওই পাইপলাইন অপারেশনের জন্য দ্বিতীয়বার টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে। সেই প্রক্রিয়ার প্রথম পর্ব অর্থাৎ টেন্ডার জমার শেষ তারিখ ১৭ ফেব্রুয়ারি। অথচ এর ১০ দিন আগে চীনা কোম্পানি প্রকল্পের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে বিদায় নেবে। ফলে বিষয়টি নিয়ে একধরনের ঝুঁকির পাশাপাশি নানামুখী সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

বিপিসি জানিয়েছে, এ পর্যন্ত সিপিপি, মালয়েশিয়ার পার্টামিনা রিফাইনারি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দুটি কোম্পানি টেন্ডারের ডকুমেন্ট কিনেছে। তবে এখনো কেউ জমা দেয়নি। এর আগে এসপিএম প্রকল্প পরিচালনার জন্য গত বছর প্রথম টেন্ডার আহ্বান করা হয়। ওই টেন্ডারে সিপিপি এবং মালয়েশিয়ার পার্টামিনা অংশ নেয়। তবে সিপিপি টেন্ডারে অযোগ্য হয়ে যায়। অপরদিকে পার্টামিনার অস্বাভাবিক চার্জের কারণে সরকার টেন্ডারটি বাতিল করে দেয়।

প্রকল্পটির আওতায় আমদানি করা জ্বালানি তেল খালাসের জন্য বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) ২২০ কিলোমিটার পাইপলাইন বসানোর কাজ শেষ হয় ২০২৩ সালের অক্টোবরে। কিন্তু প্রকল্পের কাজ ঠিকমতো বুঝিয়ে না দেওয়া এবং অপারেটর না থাকায় এতদিন সেটি ব্যবহার করা যায়নি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সমুদ্রসীমা ও কর্ণফুলি নদী মিলিয়ে ২২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এ প্রকল্প এবং ২ লাখ টন ধারণক্ষমতার ট্যাংক রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিমাসে খরচ হচ্ছে ৫ কোটি টাকার মতো। সেই হিসাবে পাইপলাইনটি ব্যবহার করা না গেলেও সরকারের এখন পর্যন্ত শুধু রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয়েছে ১৩০ কোটি টাকা। বিপিসির পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (পিটিসিএল) এক কর্মকর্তা প্রতিবেদককে বলেন, কোনো আউটপুট না থাকলেও প্রকল্পটি রক্ষণাবেক্ষণ করতে গিয়ে সরকারকে প্রতিমাসে বিপুল অঙ্কের গচ্চা দিতে হচ্ছে। তিনি জানান, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে এই আর্থিক ক্ষতি শুরু হয়ে এখনো বহাল আছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এর মধ্যে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী হিসাবে ২০ জন চীনা নাগরিক এবং স্থানীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ৫০ জন, ফায়ার সার্ভিস বিভাগের স্টাফের বেতন-ভাতা ছাড়াও পুরো পাইপলাইনের নিরাপত্তাব্যবস্থা, ৩৫টি ছোট-বড় জেনারেটর, টাগবোটসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করতেও বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। যার খরচ মাসে ৪-৫ কোটি টকার কম নয়। এছাড়া ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ২০২৩ সালের পর থেকে স্টোরেজ ট্যাংকারে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা মূল্যের ৩৯ হাজার এবং পাইপলাইনে ২০ হাজার টন তেল জমা আছে। এ কারণে প্রকল্পটি ঘিরে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সব সময় লেগেই থাকে। উপরন্তু ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ না হলে যে কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনারও আশঙ্কা রয়েছে।

বিপিসি জানিয়েছে, দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী ২০২৩ সালের অক্টোবরে পাইপলাইনটি একবার পরীক্ষা করে প্রচুর ত্রুটি পাওয়া যায়। ওই সময় পাইপলাইনটি ফেটে যায়। অধিকতর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নে ২০২৪ সালে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা করা হয়। এরপরও প্রকল্পটির ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। বিপিসির পক্ষে পাইপলাইনটির নির্মাণকাজ দেখভালের জন্য নিয়োজিত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইএলএফ ইতোমধ্যে বেশকিছু অভিযোগ মীমাংসা করতে বলেছে চীনা কোম্পানি সিপিপিকে। সেগুলোর কাজ চলছে।

বিপিসি জানায়, ৭ ফেব্রুয়ারি এ প্রকল্পে সিপিপির ত্রুটি সংশোধনের সময় (ডিফেকটিভ লায়াবেলিটি প্রিয়ড) শেষ হচ্ছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান থাকলেও বাংলাদেশের পিটিসিএল সেই ত্রুটি সংশোধন বা বুঝিয়ে নেওয়ার মতো দক্ষতা নেই। এ কারণে দুশ্চিন্তা বেশি নীতিনির্ধারকদের। কারণ, এরপর কোনো ত্রুটি থাকলেও চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কিছুই করবে না। জানা যায়, তাদের এ ত্রুটি সংশোধনের সময়সীমা ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর জন্য বলা হলে প্রতিষ্ঠানটি মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করে, যা বাংলাদেশের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়।

সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই প্রকল্পে শুরু থেকেই প্রচুর অনিয়ম আছে। এছাড়া এ ধরনের জটিল প্রকল্পে ঠিকাদারকেই ৩ থেকে ৫ বছর অপারেশনের দায়িত্বে থাকতে হয়, যা স্বাভাবিকভাবে টেন্ডারের শর্ত হিসাবে রাখা উচিত ছিল। কিন্তু এই শর্ত না দিয়ে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিপিপিকে কেবল কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি বিপিসির বড় ধরনের দায়িত্ব অবহেলা। কেউ কেউ মনে করেন, চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য এটি ইচ্ছাকৃত ভুল। ফলে এ বিষয়গুলো অবশ্যই তদন্তের দাবি রাখে।

এদিকে আরেকটি জটিল বিষয় হলো-নতুন করে কোনো কোম্পানিকে অপারেশনের দায়িত্ব দেওয়া হলে তারা সেটি কতটুকু পারবে, তা নিয়েও নানা সংশয় রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, মূলত এ কারণেই বারবার দরপত্র আহ্বান করলেও কেউ আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

নীতিনির্ধারকরা বলেন, ১৭ মাসে নানা চেষ্টা করেও এসপিএম প্রকল্পের অপারেটর নিয়োগ দেওয়া যায়নি। অথচ দুই বছর পর এ প্রকল্পের বিপরীতে নেওয়া চীনের এক্সিম ব্যাংকের ঋণের কিস্তি দিতে হবে সরকারকে। এসপিএম প্রকল্পে ব্যয় করা হয়েছে ৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে চীন থেকে। এ ঋণের বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকে সার্বভৌম নিশ্চয়তা দেওয়া আছে।

প্রসঙ্গত, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অর্থাৎ ২০১৯ সালে এটির কাজ শুরু করে সিপিপি। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রথম জাহাজ থেকে তেল খালাসের পর পাইপলাইন ফেটে যায়। পরীক্ষামূলকভাবে ডবল লাইনের এ পাইপলাইনে ২০২৪ সালের মার্চে অপরিশোধিত তেল এবং ওই বছরের মার্চে ডিজেল খালাস করা হয়। কিন্তু এটি দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার জন্য সরকারের কাছে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। ফলে এত বড় প্রকল্পের সুফল আজও মেলেনি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বৃহস্পতিবার বলেন, এত বড় একটা প্রকল্প আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে সরকারকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। সব ঠিক আছে কি না, এটি দেখার বিষয়।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পরিচালক (পরিকল্পনা) ড. আজাদুর রহমান বলেন, সিপিপিকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে বুঝিয়ে দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তারা উলটো কঠিন শর্ত দিয়েছে। তাদের শর্ত সরকারের পক্ষে মানা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় ৭ ফেব্রুয়ারি ৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বুঝে নিতে হবে।

Top