সরকার ও অন্যান্য দল হ্যাঁ ভোটের প্রচারে
মোহাম্মাদ মহাব্বাতুল্লাহ মাহাদ:অন্তর্বর্তী সরকার সরাসরি হ্যাঁ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং বিপুল প্রচারণা শুরু করেছে।নির্বাচনী সমঝোতা তৈরি করা জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১১ দল গণভোটে হ্যাঁ-এর প্রচার শুরু করেছে।বিএনপির জোট শরিক গণসংহতিসহ কয়েকটি দলও হ্যাঁ-এর পক্ষে বলছে।বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল শুক্রবার বলেছেন,গণভোটে ‘না’ দেওয়ার সুযোগ নেই।দলের মহাসচিবের এই বক্তব্য গতকাল সন্ধ্যায় বিএনপির মিডিয়া সেলের ভেরিফায়েড পেজ থেকে প্রচার করা হয়। এটা বিএনপির দলীয়ভাবে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে অবস্থানই বোঝায়।সরকারের সূত্র সমকালকে জানিয়েছে, গণভোটের প্রচার-সংশ্লিষ্টরা বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। বিএনপির কয়েকজন নেতার ফেসবুক থেকে ‘না’ ভোটের প্রচার করার পর দলটির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, এসব প্রোফাইল আসল কিনা? আসল হয়ে থাকলে, বিএনপি দলীয়ভাবে ‘না’ এর পক্ষে কিনা? বিএনপির পক্ষ থেকে জবাব আসে, তারা ‘না’ এর পক্ষে নয়।
কী আছে গণভোটে
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিনে গণভোট হবে। গত ১৩ নভেম্বর জারি করা ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’ অনুযায়ী, চারটি অংশের একটি প্রশ্নে হবে গণভোট। তবে চার প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে একটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে। গত ১৭ অক্টোবর রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ এবং জুলাই আদেশে উল্লেখিত ৪৮টি সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর হবে এই গণভোট। এনসিপি এখনও জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি।
বিএনপি
বিএনপির কোনো কোনো নেতাকর্মী সামাজিক মাধ্যমে ‘না’ ভোটের প্রচার চালাচ্ছেন কেন– এ প্রশ্নে গতকাল শুক্রবার ঠাকুরগাঁওয়ে অনুষ্ঠানে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, একই দিনে গণভোট এবং জাতীয় নির্বাচন আমরা চেয়েছিলাম। সেভাবেই হয়েছে। সংস্কার বিষয়ে যে গণভোট হচ্ছে, সেগুলো আমরাই বহু আগে ২০১৬ এবং ২০২৩ সালে ৩১ দফার মাধ্যমে জাতির সামনে তুলে ধরেছিলাম। সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। সেখানে ‘না’ বলার কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না।
সম্প্রতি এক প্রচার সভায় শেরপুর জেলার শ্রীবর্দী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফজলুল হক চৌধুরী আকুলকে বলতে শোনা যায়, ‘গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে ১৬ ডিসেম্বর, ২৬ মার্চ থাকবে না। জুলাই সনদে লেখা রয়েছে, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হবে। গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে, আওয়ামী লীগ স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ হবে।’ তাঁর এই বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। যদিও জুলাই সনদে এসব প্রস্তাব নেই।
ফখরুলের বক্তব্যে সরকারে স্বস্তি
প্রথমে সিদ্ধান্ত ছিল সরকার শুধু গণভোটের প্রচার চালাবে। হ্যাঁ বা না ভোটের পক্ষে-বিপক্ষে কিছু বলবে না। তবে গত সোমবার যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে এই অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে। সরাসরি হ্যাঁ ভোটের প্রচার শুরু করেছে সরকার। মন্ত্রণালয় এবং সরকারি সংস্থার কর্মচারীদের এতে যুক্ত করা হয়েছে। প্রচারপত্র ও ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করে বার্তা দেওয়া হচ্ছে, ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান রোধ এবং সংস্কারের জন্য হ্যাঁ ভোট দিতে হবে। এনজিওগুলোকেও হ্যাঁ ভোটের প্রচারে যুক্ত করেছে সরকার।
গণভোটের সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সব দলের প্রচেষ্টায় সংস্কারের যে রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে হ্যাঁ ভোটকে জয়ী করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে সরকারের জবাবদিহি থাকে। কেউ যেন ক্ষমতার অপব্যবহার করে সংবিধান পাল্টে ফেলে স্বৈরাচার হতে না পারে।প্রধান উপদেষ্টার আরেক বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেছেন,জনসম্পৃক্ততা রয়েছে– এমন মন্ত্রণালয়গুলোকে এ প্রচারে যুক্ত করা হবে।নির্বাচনের আগ পর্যন্ত প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজে সারাদেশে সব মসজিদ থেকে গণভোটে অংশ নিতে মুসল্লিদের উদ্বুদ্ধ করবেন ইমাম-খতিবরা। মন্দির, প্যাগোডা, চার্চ থেকেও গণভোটের প্রচার চালানো হবে।সরকারের বিভিন্ন ভাতাভোগীর মাধ্যমেও প্রচার করা হবে।হ্যাঁ ভোট জয়ী হলে ১৮০ দিনের মধ্যে এসব সংস্কার বাস্তবায়ন করে সংবিধান সংশোধন করবে আগামী নির্বাচনে জয়ী এমপিদের নিয়ে গঠিত সংবিধান সংস্কার পরিষদ।
জামায়াত, এনসিপিসহ বিএনপির শরিকরা হ্যাঁ ভোটের পক্ষে
জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা গড়ার সময় এনসিপির যুক্তি ছিল, সংস্কার বাস্তবায়নেই তারা এক হয়েছে। একই কথা বলছে ১১ দল। জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান গতকালও হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচার চালান।
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন হতে পারে, তাই এনসিপি নেতারা নির্বাচনের মাঠে দলীয় প্রতীকে নয়, আপাতত হ্যাঁ ভোট চাইছেন। দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেনবলেছেন, ভোটারদের বোঝাচ্ছি, নির্বাচন আসবে-যাবে; কিন্তু গণভোট একবার। আর যাতে শেখ হাসিনার মতো স্বৈরাচার না আসে, সে জন্য সংস্কার হতে হবে। সংস্কারের জন্য হ্যাঁ ভোট দিতে বলছি।জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, শুরু থেকেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার চলছে।বিএনপির শরিক গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জুনায়েদ সাকি সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষ নিয়ে প্রচার শুরু করেছেন। গণঅধিকার পরিষদও ‘হ্যাঁ’ ভোট চাইছে।