জোটে আছে ভোটে নেই,ভোট শেষে কোনো কদর নেই - Alokitobarta
আজ : মঙ্গলবার, ৩রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ
ভারতে পলাতক আ,লীগের সাবেক এমপি জোয়াহেরুলের মরদেহ বেনাপোল সীমান্তে হস্তান্তর ধর্ষকদের ছাড়ের সুযোগ নেই: জামায়াতে ইসলামী ফ্যাটি লিভার রোগীদের জন্য রোজা উপকারী নাকি ঝুঁকিপূর্ণ? সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা করেছিলাম, হয়েছে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে পরামর্শক খাতেই ৩২২ কোটি টাকা আবদার প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন ড. মোশাররফ পাসপোর্ট দালালদের আশা ভেস্তে গেল বরিশালে চেকপোস্টে সেনাবাহিনীর সদস্য কর্তৃক সাংবাদিককে হেনস্তার অভিযোগ, সাংবাদিক মহলে উদ্বেগ আ. লীগের কার্যালয় খুলে দেওয়া গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত বাকেরগঞ্জে সর্বস্তরের সাংবাদিকদের নিয়ে ইফতার করলো জামায়াত

জোটে আছে ভোটে নেই,ভোট শেষে কোনো কদর নেই


মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া:ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনীতিতে ছোট দলগুলোর কদর বাড়ছে। জোট গঠন ও পরিধি বাড়াতে ছোট দলকে কাছে টানতে বড় দলগুলোর নানামুখি তৎপরতা এখন দৃশ্যমান।বড় দলগুলো ছোট দল নিয়ে জোটের পরিধি বড় করে। কিন্তু ভোট ব্যাংকে এর বড় কোনো প্রভাব পড়ে না।প্রতিবারই ভোট শেষে দেখা যায়, হাতে গোনা কয়েকটি দলের বাইরে অন্যদের আসন শূন্য; ভোটের অংকও নগণ্য। ভোটের আগে ছোট দলগুলোর কদর থাকলেও ভোট শেষে বেশিরভাগ দলের আর কোনো খোঁজ থাকে না।তবে পরিসংখ্যান বলছে, সংসদ নির্বাচন এলে কে কার সঙ্গে জোট গড়বে সেই আলোচনায় দর-কষাকষির চলে মূলত আসন ভাগাভাগি নিয়ে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ নির্বাচন এলে প্রধান দলগুলোকে ঘিরে জোট বাঁধার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়, তাতে দল ভারী হলেও ভোট ব্যাংকে বড় কোনো প্রভাব পড়ে না। এবারের নির্বাচনে ছোট দলগুলো আরও বিপাকে পড়বে উল্লেখ করে বিশ্লেষকরা বলছেন, এবার অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন সংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) পরিবর্তন এনেছে। সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী আগামী নির্বাচনে কোনো দল জোটগতভাবে নির্বাচন করলেও ভোটের লড়াই করতে হবে নিজ দলীয় প্রতীকে। নতুন এই আদেশ আগামী নির্বাচনে জোট গঠন ও ভোটের লড়াইয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া শতাধিক রাজনৈতিক দলের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, একটি নির্বাচনে সব মিলিয়ে লাখের বেশি ভোট পেয়েছে এরকম দল আছে ১৬টি। ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৭৫টি দল অংশ নিয়েছিল। সেখানে একটি দল একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ভোট পেয়েছিল ২৫টি। দেড় যুগ পর ২০০৮ সালে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হওয়ার পর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় ৩৮টি দল। তাতে একটি দল এক আসনে অংশ নিয়ে ভোট পায় ২৯৭টি। গত সাড়ে তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম দলের অংশগ্রহণ ছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম ও ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। এর মধ্যে দশম সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ১২টি দলের মধ্যে পাঁচটি দলেরই মোট ভোট দশ হাজারের নিচে ছিল। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৮টি দল অংশ নিলেও ১৮ দলের মোট ভোট দশ হাজারের নিচে। ভোটের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কখনও কখনও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোটের অংকে অনেক দলীয় প্রার্থীর চেয়ে এগিয়ে থাকেন। তাদের অধিকাংশই দলছুট বা বিদ্রোহী প্রার্থী। আর পঞ্চম থেকে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এক শতাংশের বেশি ভোট পায়নি ২৬ দল।

এক শতাংশের বেশি ভোট নেই ২৬ দলের : ২০১৪ সালের দশম, ২০১৮ সালের একাদশ ও ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল বিতর্কিত। এর মধ্যে দশম ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন হয় একতরফা। আর একাদশ সংসদ নিবাচন দিনের ভোট রাতে হয়েছে এমন অভিযোগ আছে। এর আগে ৯১ থেকে ২০০৮ সালের চারটি নির্বাচনে ফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এক শতাংশের বেশি ভোট পায়নি নির্বাচনে অংশ নেওয়া ২৬টি দল। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিসংখ্যান বলছে, সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরের শাসন শেষে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে অংশ নেয় ৩৮টি দল। এরশাদের জাতীয় পার্টিসহ ১৪ দলীয় মহাজোট গঠন করে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দল গঠিত চারদলীয় জোটের ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। নিবন্ধিত দল জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন মহাজোটের অংশ হিসাবে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকেই ভোটে অংশ নেয়। জাতীয় পার্টি জোটে থাকলেও ভোট করে নিজেদের লাঙ্গল প্রতীকে। অন্যদিকে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের নিবন্ধিত দল বিজেপি, ইসলামী ঐক্যজোট ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি ওই নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। আরেক জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী ভোট করে নিজেদের প্রতীক দাঁড়িপাল্লায়। নির্বাচনে মহাজোটের শরিকদের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪৯ শতাংশ, জাসদ ০.৬ শতাংশ, ওয়ার্কার্স পার্টি ০.৩ শতাংশ ভোট পায়। আর নিজেদের প্রতীকে ভোট করা জাতীয় পার্টি পায় ৭.০ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে বিএনপি ৩৩.২ শতাংশ, ইসলামী ঐক্যজোট ০.১ শতাংশ, বিজেপি ০.১ শতাংশ ভোট পায়। আর জোটের আরেক শরিক জামায়াতে ইসলামী পায় ৪.৬ শতাংশ ভোট।

আসন্ন নির্বাচনে ছোট দলের কদর থাকলেও আছে নানা হিসাব : বর্তমানে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৫৬। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক স্থগিত রয়েছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনেও ছোট দলের কদর বাড়ছে। বিশেষ করে বড় দল বিএনপি বৃহৎ জোট গঠনের চেষ্টা করছে। আরেক দল জামায়াতও কয়েকটি দল নিয়ে নির্বাচনি সমঝোতার পথে। তরুণদের দল এনসিপিও বসে নেই। কয়েকটি দল নিয়ে শিগগিরই জোট ঘোষণার কথা রয়েছে তাদের। একই পথে বাম ঘরানার দলগুলো। তফশিলের আগে জোটের আত্মপ্রকাশ হতে পারে তারাও। তবে নিজস্ব প্রতীকের ভোট করার বাধ্যবাধকতা থাকায় অনেক ভেবে-চিন্তে বড় দলগুলো ছোট দলগুলোকে টানবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

অতীতের নির্বাচনে দেখা গেছে, রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের প্রক্রিয়া শুরুর পর অনিবন্ধিত কোনো দল সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারে না। তবে নিবন্ধিত দলের সঙ্গে জোট বেঁধে তাদের মার্কা নিয়ে অনিবন্ধিত দলের প্রার্থীও ভোট করতে পারে। সেক্ষেত্রে অনিবন্ধিত দলের ওই প্রার্থী কাগজে কলমে মনোনয়নদাতা নিবন্ধিত দলের প্রার্থী হিসাবেই গণ্য হন। তবে আগামী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ওই নিয়ম না থাকায় জোটে থাকলেও দলকে তার নিজস্ব প্রতীকেই নির্বাচন করতে হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে জোটের পরিসর বাড়িয়ে ভোটের মাঠ চাঙা রাখতেই বড় দলগুলো ছোট দলগুলোকে কাছে টানে। নিবন্ধন থাক বা না থাক, কর্মী-সমর্থক যত কমই হোক, জোটের রাজনীতির মূল কথা হলো দল ভারী দেখিয়ে ভোটারদের নজর কাড়া। তাছাড়া যেকোনো সরকারবিরোধী আন্দোলন কিংবা সরকারকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও বেশি দলকে জোটে রেখে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শনের নজির রয়েছে বাংলাদেশে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘অতীতের নির্বাচনে দেখা গেছে ছোট দলগুলো নিয়ে প্রধান দলগুলো জোট ভারী করলেও ভোট ব্যাংকে বড় প্রভাব পড়েনি। তবে একটা রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষ নির্ধারণ করতে এই জোট হয়তো সহায়তা করে। এনসিপি যদি বিএনপির সঙ্গে যায়; সে কারণে এনসিপি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন পেয়ে যাবে বলে আমি মনে করি না। এবার জোটের রাজনীতি কোনো বড় ফ্যাক্টর হবে না। নির্বাচনকে খুব বেশিমাত্রায় প্রভাবিত করবে সেটা মনে হয় না। এটা হলো ব্যক্তি সর্বস্ব যে দলগুলো তারা আলোচনার লাইমলাইটে থাকা পছন্দ করে। আবার বড় দলগুলোও বেশি দল নিয়ে বড় জোট সেটি বলতে পারে। এর বেশি কিছু নয়।

অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ২০০১ সালের ১ অক্টোবর। অংশগ্রহণ করে ৫৪টি দল। ৩০০ আসনে প্রার্থী ছিলেন ১৯৩৫ জন। স্বতন্ত্র ছিলেন ৪৮৪ জন। এ নির্বাচনে নৌকায় ভোট পড়ে ৪০ দশমিক ১৩ শতাংশ। বিএনপি ধানের শীষে ভোট পড়ে ৪০ দশমিক ৯৭ শতাংশ। ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ভোট ছিল ৪ দশমিক ২৮ শতাংশ। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি ভোট ছিল ১ দশমিক ১২ শতাংশ। ইসলামী ঐক্যজোটের ভোট ছিল দশমিক ৬৮ শতাংশ। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ একটি আসন পায়। ভোট পায় দশমিক ৪৭ শতাংশ।

সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ৮১টি দল। ৩০০ আসনে প্রার্থী ছিলেন ২৫৭৪ জন। এদের মধ্যে ২৮১ জন ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। ৩০ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পায় আওয়ামী লীগ। বিএনপি পায় ৩৩ দশমিক ৬১ শতাংশ। জাতীয় পার্টি পায় ৩২টি আসন। তাদের বাক্সে ভোট পড়ে ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। জামায়াতে ইসলামী পায় ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। ইসলামী ঐক্যজোট ভোট পায় ১ দশমিক ০৯ শতাংশ। দশমিক ২৩ শতাংশ ভোট পায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ।

১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ৭৫টি দল। ৩০০ আসনে প্রার্থী ছিলেন ২৭৮৭ জন। এদের মধ্যে ৪২৪ জন ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। বিএনপি ভোট পায় ৩০ দমমিক ৮১ শতাংশ; আওয়ামী লীগ পায় ৩০ দশমিক ০৮ শতাংশ। ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ ভোট জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ। ১ দশমিক ৮১ শতাংশ ভোট পায় বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক লীগ। ১ দশমিক ২২ শতাংশ জাকের পার্টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি পায় ১ দশমিক ১৯ শতাংশ। ইসলামী ঐক্যজোট দশমিক ৭৯ শতাংশ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (মুজাফফর) পায় দশমিক ৭৬ শতাংশ।

Top