নজিরবিহীন ব্যাংক লুটপাটের ক্ষত ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করছে - Alokitobarta
আজ : মঙ্গলবার, ৩রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদঃ

নজিরবিহীন ব্যাংক লুটপাটের ক্ষত ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করছে


মু.এ বি সিদ্দীক ভুঁইয়া:আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার নজিরবিহীন ব্যাংক লুটপাটের ক্ষত ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করছে।খেলাপি ঋণের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির কারণেই সব সূচকে আগ্রাসী আঘাত আসছে। যে কারণে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে দেশের ব্যাংক খাত। বেশির ভাগ ঋণ ধীরে ধীরে খেলাপি হচ্ছে। যে কারণে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে বেপরোয়া গতিতে। বাড়ছে প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি। কমে যাচ্ছে আয়যোগ্য সম্পদ। ফলে সার্বিকভাবে আয়ের প্রবণতাও হ্রাস পাচ্ছে। খেলাপি ঋণের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির কারণেই সব সূচকে আগ্রাসী আঘাত আসছে। যে কারণে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে দেশের ব্যাংক খাত।বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের লুটপাটে ব্যাংক খাত কার্যত এখন বিধ্বস্ত। যার খেসারত দিতে হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারকে। তবে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকারকে আরও কঠিন সংকটের মুখোমুখি হতে হবে। বলা যায়, ব্যাংক খাতের বিদ্যমান পরিস্থিতি ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য এক ধরনের অশনিসংকেত। তারা বলেন, এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের পক্ষে কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হবে। আর এ দুই সূচকে ভালো করতে না পারলে সরকার কোনো খাতে সফল হতে পারবে না। তবে সে সময় ঋণ দেওয়ার মতো ব্যাংকে যদি পর্যাপ্ত অর্থ না থাকে তখন সংকট আরও বাড়বে।

খেলাপি ঋণে রেকর্ড : বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৬ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা বিতরণ করা ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গত এক বছর ৩ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের ৯ মাসে বেড়েছে ২ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকেই সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এছাড়া অবলোপন করা ঋণ, বিশেষ বিবেচনায় নবায়ন করা ঋণসহ আরও মোটা অঙ্কের ঋণ রয়েছে, যেগুলো খেলাপির যোগ্য। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণের এই অঙ্ক রেকর্ড সৃষ্টি করেছে।

প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে দেশে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। অথচ সেই খেলাপি ঋণ এখন সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি।

লাগামহীন খেলাপি ঋণ : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে গত বছরের জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা। যা ওই সময়ে মোট বিতরণ করা ঋণের ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ওই বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ব্যাংক খাতে লুটপাটের তথ্য বেরিয়ে আসতে থাকে। ফলে বাড়তে থাকে খেলাপি ঋণের তথ্যও। যা আগে গোপন করা হয়েছিল। সরকার পতনের পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকায়। যা ছিল ওই সময়ে বিতরণ করা মোট ঋণের ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। একই বছরের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের চিত্র বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা। যা ছিল ওই সময়ে বিতরণ করা মোট ঋণের ২০ দশমিক ২০ শতাংশ। লুটপাটের সব ঋণ খেলাপি হতে শুরু করায় ২০২৫ সালের শুরু থেকে খেলাপি ঋণের মাত্রা আরও বাড়তে থাকে। গত মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকায়। যা ছিল ওই সময়ে বিতরণ করা মোট ঋণের ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশ। গত জুনে খেলাপি ঋণ আরও বেড়ে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। এতে ব্যাংক খাতের ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনেও খেলাপি ঋণের হালনাগাদ তথ্য ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি। কারণ বর্ধিত খেলাপি ঋণের তথ্য ব্যবহার করে সূচকগুলো তৈরি করলে ব্যাংক খাতের সার্বিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটত। যে কারণে জুন প্রান্তিকের তথ্য গোপন করা হয়।

প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি বাড়ছে : এদিকে খেলাপি ঋণের চাপে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে প্রভিশন ঘাটতি। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে প্রভিশন ঘাটতি ছিল ২৫ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বরে তা লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করে। গত জুনে তা আরও বেড়ে ৩ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়। গত সেপ্টেম্বরে এ ঘাটতি কিছুটা কমে ৩ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি বাড়ছে মূলধন ঘাটতিও। এছাড়াও ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান কমে যাচ্ছে। বেড়ে যাচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ। এতে কমছে আয়। এসব কারণে অন্তত ৫০-৬০% ব্যাংক বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, প্রকৃত খেলাপি ঋণ ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। কারণ ঋণ অবলোপন, নবায়ন ও আদালতে আটকে থাকা ঋণ এখানে হিসাব করা হয়নি। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রত্যেক ব্যাংকের শীর্ষ ১০ খেলাপিকে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচার করতে হবে। তা না হলে এর থেকে দেশ বের হতে পারবে না।

জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বুধবার রাতে বলেন, কর্মসংস্থান বাড়ানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ বিনিয়োগ বাড়াতে না পারলে কর্মসংস্থান হবে না। তিনি বলেন, বিনিয়োগের জন্য বিপুল অঙ্কের টাকার দরকার। কিন্তু সেই টাকা তো বিগত আওয়ামী লীগ সরকার বিদেশে পাচার করে নিয়ে গেছে। ফলে বেশির ভাগ ব্যাংকের অবস্থা এখন খুবই নাজুক। তাহলে বিনিয়োগের জন্য টাকা কোথা থেকে আসবে। মূলত এটিই হবে নির্বাচিত সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

সূত্র জানায়, বর্তমানে মোট ব্যাংকের পঞ্চাশ ভাগ চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। খেলাপি ঋণের ফাঁদে পড়ে এই ব্যাংকগুলো এক রকম পঙ্গু হয়ে গেছে। এখানে এখন সমস্যা দুটি। একটি হলো আমানতকারীদের টাকা ফেরত কিভাবে দেওয়া হবে, দ্বিতীয়ত, আস্থাহীনতার কারণে নতুন আমানতকারীও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে এ ব্যাংকগুলো দেশের বিনিয়োগ-অর্থনীতিতে কোনো অবদান রাখতে পারছে না।

অবশিষ্ট ব্যাংকগুলোর মধ্যে কিছু ব্যাংক এখনো সবল থাকলেও বাকিগুলোর অবস্থা মধ্যম মানের। ফলে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যে পরিমাণ বিনিয়োগ চাহিদা তৈরি হবে বলে ধারণা করা যায়, তার ধারে কাছেও ব্যাংকে পুঁজি নেই। এছাড়া বিনিয়োগের সামনে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা হলো উচ্চ সুদ। বর্তমানে ঋণের সুদের হার ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তাহলে এই হারে সুদ দিয়ে কেউ ঋণ নিয়ে ব্যবসা করার সাহস দেখাবে না।বর্তমানে আমানত সংগ্রহের জন্য দুর্বল ব্যাংকগুলোর হাহাকার অবস্থা। এ কারণে সক্ষমতা না থাকলেও এসব ব্যাংক ১৩-১৪ শতাংশ পর্যন্ত সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভবিষ্যতে এটিও বড় ডিজাস্টার তৈরি করবে। কারণ যারা এসব ব্যাংক থেকে উচ্চসুদে ঋণে নিচ্ছে বা নেবে তারাও এক সময় খেলাপি হয়ে যাবে। ফলে ব্যাংক অর্থনীতির এ রকম নানামুখী ভুলের ঝুঁকি আগামী নির্বাচিত সরকারকে বেশ ভোগাবে।

Top