যাচ্ছে চলে বিদেশে এফডিআই’র ৬৪ ভাগ - Alokitobarta
আজ : সোমবার, ১লা ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

যাচ্ছে চলে বিদেশে এফডিআই’র ৬৪ ভাগ


মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া:প্রতিবছর যে পরিমাণ সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বা এফডিআই দেশে আসছে, এর একটি বড় অংশই আবার মুনাফা বা আগের বিনিয়োগের অংশবিশেষ তুলে নেওয়ার মাধ্যমে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।গত দুই বছরে এটি বেড়েছে অতিমাত্রায়, তিনগুণের বেশি।এ হার প্রায় ৬৪ শতাংশ।অথচ আগের এক দশকে তা ছিল ২৭ শতাংশের কম।সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন,হঠাৎ বিদেশে নেওয়া অর্থের পরিমাণ কেন বাড়ল,তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।ফলে এসব অর্থ পুনরায় বিদেশে চলে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অনুযায়ী,তিনটি উপকরণ বিদেশি বিনিয়োগ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। এগুলো হচ্ছে-পুঁজি হিসাবে বিদেশ থেকে আনা অর্থ, দেশে বিদেশি কোম্পানিগুলো ব্যবসা করে অর্জিত মুনাফা বিদেশে না নিয়ে পুনরায় বিনিয়োগ এবং এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানি ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করলে। এ তিনটি উপকরণ মিলে মোট বিনিয়োগকে ‘গ্রস বিনিয়োগ’ বলা হয়। এর মধ্যে অর্জিত মুনাফা থেকে পুনরায় বিনিয়োগ এবং এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানি ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করলে তা হচ্ছে দেশীয় উৎস থেকে আসা। তবে বিদেশি কোম্পানিগুলো এ অর্থ বিদেশে নিয়ে যেতে পারে। সেজন্য বিদেশে না নিয়ে দেশে বিনিয়োগ করলে সেটিকে ‘নতুন বিনিয়োগ’ ধরা হয়। কেবল পুঁজি হিসাবে যে বিনিয়োগ আসে, সেটিই ‘প্রকৃত বিনিয়োগ’। গ্রস বিনিয়োগ থেকে প্রতিবছর মুনাফা ও পুঁজি তুলে নেওয়ার পরিমাণ বাদ দিলে যে অর্থ থাকে, একে ‘নিট বিনিয়োগ’ ধরা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে গ্রস এফডিআই এসেছিল ৪৪৩ কোটি ডলার। ওই বছরে দেশে কার্যরত বিদেশি কোম্পানিগুলো মুনাফা এবং আগের করা বিনিয়োগ থেকে বিদেশে নিয়েছে ১১৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ ওই বছরে দেশে যে পরিমাণ বিনিয়োগ এসেছে, এর ২৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ অর্থ নিয়ে গেছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ বছরে অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে করা বিনিয়োগ থেকে বিদেশে অর্থ নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায় প্রায় তিনগুণ। ওই বছরে দেশে গ্রস বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল ৪১৯ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ২৪ কোটি ডলার কম। কিন্তু ওই বছরে বিদেশে পাঠানো হয়েছে ২৭২ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ১৫৪ কোটি ডলার বেশি। অর্থাৎ দেশে বিনিয়োগ বাবদ আসা অর্থের ৬৪ দশমিক ৯২ শতাংশ আবার বিদেশে পাঠানো হয়েছে।একই ঘটনা ঘটেছে গত অর্থবছরেও। ওই অর্থবছরে দেশে গ্রস বিনিয়োগ এসেছে ৪৬৫ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ৪৬ কোটি ডলার বেশি। একই সময়ে মুনাফা ও আগের বিনিয়োগ বাবদ তুলে নেওয়া ছিল রেকর্ড পরিমাণে বেশি-২৯৬ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২৪ কোটি ডলার বেশি। অর্থাৎ ওই বছরে দেশে আসা বিনিয়োগের ৬৩ দশমিক ৬৬ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, আলোচ্য দুই অর্থবছরে দেশের অর্থনীতিতে এমন কোনো নাটকীয় পরিবর্তন আসেনি যে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দেশ থেকে পুঁজি তুলে নিয়ে চলে যাবেন। এমন কোনো আতঙ্ক তৈরি হয়নি যে বিনিয়োগের অর্থ নেওয়া যাবে না। তারপরও কেন তারা এত মাত্রায় অর্থ ওই দুই বছরে তুলে নিলেন, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

অর্থনীতিবিদদের অনেকের ধারণা, দেশে যেসব বিদেশি বিনিয়োগ গত কয়েক বছরে এসেছে, সেগুলো দেশ থেকে পাচার করা অর্থের একটি অংশ। বিদেশে পাচার করা অর্থই আবার ‘বিদেশি বিনিয়োগ’ হিসাবে দেশে এসেছে। ২০২২ সালের মাঝামাঝি দেশে ডলার সংকট সৃষ্টি হয়েছিল এবং এক বছরেও তা নিরসন হচ্ছিল না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার সেসময় বারবার বলছিলেন, আগামী এক মাসের মধ্যে ডলার সংকট মিটে যাবে, তিন মাসের মধ্যে মিটে যাবে। কিন্তু সংকট আরও প্রকট হচ্ছিল। ফলে ওই সময়ে পাচার করা অর্থ যারা বিদেশি বিনিয়োগ হিসাবে দেশে এনেছিলেন, তাদের মধ্যেও একটি আতঙ্ক ভর করে। ডলার সংকটের কারণে যদি বিনিয়োগের অর্থ তুলে নিতে না পারেন-এমন শঙ্কায় তারা ভুগছিলেন। যে কারণে তারা বিনিয়োগ তুলে নিতে থাকেন। এতে ডলার সংকট আরও প্রকট হয়। গত বছর জুলাই আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখনও দেশ থেকে বিদেশি বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেশি ছিল। যে কারণে ওই দুই অর্থবছরে দেশ থেকে বেশি মাত্রায় বিদেশি বিনিয়োগ তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে ডলার সংকটের মাত্রাও বেড়েছিল।

প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে গত অর্থবছর পর্যন্ত ১১ বছরের মধ্যে ৯ বছরই দেশ থেকে বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফা এবং আগের করা বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার প্রবণতা স্থিতিশীল ছিল। ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর-৯ বছরে প্রতিবছর দেশে আসা গ্রস বিনিয়োগের প্রায় ২৫ শতাংশ অর্থ ফের বিদেশে নেওয়া হয়। কোনো কোনো বছর এ হার সামান্য ওঠানামা করেছে। এর মধ্যে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তুলে নেওয়ার প্রবণতা ছিল সবচেয়ে বেশি-২৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে নেওয়া হয়েছে সবচেয়ে কম-১৯ দশমিক ০৮ শতাংশ। বাকি বছরগুলোয় এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। গত দুই অর্থবছরেই ৬৩ শতাংশের বেশি তুলে নেওয়া হয়েছে, যা একেবারেই অস্বাভাবিক ও উদ্বেগজনক।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে গ্রস বিনিয়োগ এসেছিল ২৫২ কোটি ডলার। এর বিপরীতে তুলে নেওয়া হয়েছে ৬৯ কোটি ডলার, যা দেশে আসা গ্রস বিনিয়োগের ২৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে গ্রস বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল ২৫০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ২ কোটি ডলার কম। ওই বছরে তুলে নেওয়া হয়েছিল ৫০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ১৯ কোটি ডলার কম। কম অর্থ তুলে নেওয়ায় ওই বছরে এ হার ছিল ২০ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে গ্রস এফডিআই এসেছিল ৩০৪ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৪ কোটি ডলার বেশি। একই সময়ে মুনাফা এবং আগের বিনিয়োগ থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল ৫৮ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ৮ কোটি ডলার বেশি। ওই বছরে বিনিয়োগ বাড়ায় বেশি অর্থ বিদেশে নিয়ে গেলেও শতকরা হিসাবে কম ছিল অর্থাৎ ১৯ দশমিক ০৮ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে গ্রস বিনিয়োগ এসেছিল ৩২৯ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২৫ কোটি ডলার বেশি। ওই বছরে তুলে নেওয়া হয়েছিল ৭১ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ১৩ কোটি ডলার বেশি। মোট বিনিয়োগের ২১ দশমিক ২৮ শতাংশ অর্থ বিদেশে নেওয়া হয়েছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে গ্রস বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল ৪৯৫ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ১৬৬ কোটি ডলার বেশি। একই বছরে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল ১০৬ কোটি ডলার, আগের বছরের চেয়ে ৩৫ কোটি ডলার বেশি। একই সঙ্গে ১১ বছরের মধ্যে এটিই ছিল দেশে আসা সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ এবং ওই বছরেই তুলে নেওয়া অর্থ শতকোটি ডলার অতিক্রম করে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিনিয়োগ এসেছিল ৩২৩ কোটি, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭২ কোটি ডলার কম। ওই বছরে বিদেশে নেওয়া হয়েছিল ৮৬ কোটি, যা আগের বছরের চেয়ে ২০ কোটি ডলার কম। ওই বছরে মোট বিনিয়োগের মধ্যে তুলে নেওয়া হয়েছিল ২৬ দশমিক ৬২ শতাংশ।

২০২০-২১ অর্থবছরে গ্রস বিনিয়োগ এসেছিল ৩৩৯ কোটি ডলার, যা ছিল আগের বছরের তুলনায় ১৬ কোটি বেশি। বিদেশে নেওয়া হয়েছিল ৮৮ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ২ কোটি বেশি। ওই বছরে মোট বিনিয়োগের ২৫ দশমিক ৯৬ শতাংশের সমান অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে গ্রস বিনিয়োগ এসেছিল ৪৬৪ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ১২৫ কোটি বেশি। বিদেশে নেওয়া হয়েছিল ১২০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ৩২ কোটি ডলার বেশি। ওই সময়ে গ্রস বিনিয়োগের ২৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছিল।

Top