পরস্পরবিরোধী মত দিয়েছেন সরকারের মন্ত্রীরা - Alokitobarta
আজ : রবিবার, ১৪ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১লা বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

পরস্পরবিরোধী মত দিয়েছেন সরকারের মন্ত্রীরা


মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া :বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া রাজনীতি করতে পারবেন কি,পারবেন না-এমন প্রশ্নে পরস্পরবিরোধী মত দিয়েছেন সরকারের মন্ত্রীরা। নির্বাহী আদেশে দণ্ড স্থগিত থাকায় জেলের বাইরে থাকা সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর রাজনীতি করা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য জানাচ্ছেন তারা।আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারবেন কি না তা নিয়েও মন্তব্য করা হচ্ছে। মন্ত্রীদের কেউ বলেছেন, খালেদা জিয়ার রাজনীতি করা নিয়ে কোনো শর্ত নেই। অর্থাৎ রাজনীতিতে বাধা নেই। তিনি জেলে থেকেও রাজনীতি করতে পারবেন।আবার কোনো মন্ত্রীর মতে, যে শর্তে তার দণ্ড স্থগিত করা হয়েছে, তাতে তিনি রাজনীতি করতে পারবেন না। এ ছাড়া দণ্ডিত ব্যক্তির রাজনীতি করার সুযোগ কোথায়। তাদের এসব বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানান হিসাব-নিকাশ।আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, খালেদা জিয়া কি দণ্ডাদেশ থেকে মুক্তি পেয়েছেন? তিনি যে দণ্ডিত, কনভিক্টটেড, সেটা থেকে তিনি কি মুক্তি পেয়েছেন? যেটুকু পেয়েছেন, সেটা মানবিক কারণে।শেখ হাসিনার উদারতার জন্য এটা হয়েছে। কি জন্য? মানবিক কারণটা কেন? অসুস্থ মানুষকে মানবিক কারণে তার সাজা স্থগিত করা হয়েছে, দণ্ডমুক্ত নয়। অসুস্থ না হলে তিনি থাকতেন কোথায়? কারাগারে। ঠিক আছে? তাহলে দণ্ডিত ব্যক্তির রাজনীতি করার সুযোগ কোথায়?

বৃহস্পতিবার বিকালে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক যৌথসভায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, মানবিক কারণটি আমাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেখেছেন, তাই তিনি মুক্তি পেয়েছেন।
তা না হলে দণ্ডিত ব্যক্তি তো জেলে থাকবে। আর দণ্ডিত ব্যক্তি এটা নিয়ে তাদের (বিএনপির) সন্দেহ থাকলে ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে কেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করে? নিশ্চয়ই তিনি (খালেদা জিয়া) ভ্যালিডেবল না, সেজন্য তাকে (তারেক রহমান) এনে বসিয়েছে।
অন্যদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন উলটো। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, নির্বাহী আদেশে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাময়িক মুক্তির ক্ষেত্রে রাজনীতি করা নিয়ে কোনো শর্ত দেওয়া হয়নি।তবে তার শারীরিক অবস্থা রাজনীতি করার মতো নয়। বৃহস্পতিবার ঢাকায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ আয়োজিত এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এ কথা বলেন আইনমন্ত্রী।তিনি আরও বলেন, উনি (খালেদা জিয়া) ঢাকার নিজ বাসায় থেকে চিকিৎসা নেবেন, দেশের বাইরে যেতে পারবেন না। এর বাইরে কোনো শর্ত নেই। আপনারা (সাংবাদিক) প্রশ্ন করেছেন উনি রাজনীতি করতে পারবেন কিনা। আমি সত্য বলি বলেই বলেছি, রাজনীতি করার ব্যাপারে কোনো শর্ত নেই।

ওই শর্ত নিয়ে ফের আইনমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আনিসুল হক বলেন, উনি নির্বাচন করতে পারবেন না কারণ উনি দণ্ডিত, রাজনীতি করতে পারবেন না এমন কথা কোথাও নেই।খালেদা জিয়ার বাস্তব পরিস্থিতিও বিবেচনা করতে হবে মন্তব্য করে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘তার যে আবেদন তার ভাইরা করেছেন, সেখানে বলা আছে তিনি গুরুতর অসুস্থ। তার যদি আরও ভালো চিকিৎসা না হয়, তাহলে তার জীবন বিপন্ন হবে।তাকে মানবতার খাতিরে প্রধানমন্ত্রী দণ্ড স্থগিত রেখে মুক্তি দিয়েছেন। তিনি অসুস্থ, তিনি রাজনীতি করতে পারবেন কিনা, সেটি আমি বারবার বলেছি। স্বাভাবিকভাবে মানুষ মনে করে তিনি অসুস্থ তার রাজনীতি করার অবস্থা নেই।এটাই বাস্তবতা। এর আগে ১৯ ফেব্রুয়ারি এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, তিনি (খালেদা জিয়া) একজন স্বাধীন মানুষ।তিনি কী করবেন না করবেন তা নিয়ে আমার বলার প্রয়োজন নেই। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারায় তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। অসুস্থতার কারণে দুটো শর্তে তাকে (খালেদা জিয়া) মুক্তি দেওয়া হয়েছে।তিনি রাজনীতি করতে পারবেন না বা রাজনীতি থেকে বিরত থাকবেন, এ রকম শর্ত সেখানে (খালেদা জিয়ার মুক্তির আবেদনে) ছিল না।এদিকে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে অনেকটা দ্বিমত পোষণ করে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, দণ্ডাদেশ স্থগিতের শর্ত অনুযায়ী খালেদা জিয়া রাজনীতি করতে পারবেন না।বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী কেউ যদি দুই বছরের বেশি শাস্তিপ্রাপ্ত হন, তিনি নির্বাচন করতে পারেন না। খালেদা জিয়া দুই বছরের অনেক বেশি দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন। তার তো নির্বাচন করার প্রশ্নই আসে না। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে পাঁচটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।তিনি আরও বলেন, শারীরিক অসুস্থতা, শারীরিক অবস্থা এবং বয়স বিবেচনায় নিয়ে খালেদা জিয়াকে শর্তসাপেক্ষে কারাগারের বাইরে ঘরে অবস্থান করার অনুমতি দিয়েছে সরকার। সেই শর্ত অনুযায়ী তিনি রাজনীতিও করতে পারেন না।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, আমি যতদূর আইন-কানুন জানি এবং বুঝি তার রাজনীতি করতে পারার কথা নয়। আমি খোঁজখবর নিয়েই বলছি, খালেদা জিয়া রাজনীতি করতে পারবেন আইনমন্ত্রী তা বলেননি।আইনমন্ত্রীর বক্তব্য ভিন্নভাবে কোনো কোনো গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তবে অন্যরা কে কি বলেছেন সে বিষয়ে আমার জানা নেই। হাছান মাহমুদ বলেন, আমি সরকারের তথ্যমন্ত্রী হিসাবে বলছি, যে শর্তে তাকে (খালেদা জিয়া) ঘরে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে সেই শর্ত অনুযায়ী তিনি রাজনীতি করতে পারার কথা নয়।কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, নির্বাহী আদেশে দণ্ড স্থগিত থাকা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনীতি করতে কোনো বাধা নেই। মন্ত্রী আরও বলেন, খালেদা জিয়া কেন রাজনীতি করতে পারবেন না? উনি জেলে থেকেও রাজনীতি করতে পারবেন, দলকে নির্দেশনা দেবেন। তিনি একটি রাজনৈতিক দলের নেতা এবং দুবারের প্রধানমন্ত্রী। রাজনীতিবিদ তো রাজনীতিবিদই। তবে নির্বাচন করতে পারবেন কিনা-সেটি নির্বাচন কমিশন নির্ধারণ করবে। আইনে যা আছে সেটাই হবে। সেই অনুযায়ী তাকে নির্বাচনে আসতে হবে।বুধবার সচিবালয়ে ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইওয়ামা কিমিনোরির সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। দুর্নীতির দুটি মামলায় ১৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত খালেদা জিয়া ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে বন্দি ছিলেন। প্রথমে তাকে পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হলেও একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়।২৫ মাস কারাভোগের পর ২০২০ সালের ২৫ মার্চ সরকার খালেদা জিয়াকে নির্বাহী আদেশে মুক্তি দেয়। তারপর থেকে তিনি গুলশানের ভাড়া বাসায় থাকছেন। কয়েকবার চিকিৎসার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে যাওয়া ছাড়া প্রায় তিন বছর সময়ে খালেদা জিয়া বাসা থেকে বের হননি। রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচিতেও তাকে দেখা যায়নি।

Top
%d bloggers like this: